রাফারা চিরকাল সুখেই থাকে (শেষ পর্ব)

১৬ঘন্টা পর রাফার জ্ঞান ফেরে।ভাগ্যিস সেই রাতে রাফার বাবা আফতাব উদ্দিন মেয়ের অবস্থা শুনে সৌদি আরব থেকে ফিরে এসেছেন।এসেই মেয়ে ঘুমাচ্ছে শুনে,দেখতে রুমে এসে টেবিলের উপর চিরকুট দেখে তাড়াতাড়ি স্থানীয় ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ায় এ যাত্রা রক্ষা।

রাফা চোখ খোলে অশ্রুসিক্ত বাবা মা আর একমাত্র ভাইকে দেখে নিজের জল আটকাতে পারে না। এদিক সেদিক তাকিয়ে শুধু প্রিয়জনদের দেখে।
আফতাব উদ্দিন মেয়ের হাত ধরেন,আমাদের ভালোবাসা তোর কাছে এত তুচ্ছ রাফা! ১৮টা বছর তোকে এত ভালোবেসে বড় করলাম আর মাত্র কদিনের ভালোবাসার জন্য আমাদের ছেড়ে যাওয়ার ডিশিসান নিয়ে নিলি। তুই চলে যাবার পর কি হবে আমাদের ভেবেছিস।তোর মা কাল রাত থেকে একফোঁটা পানি পান করেনি। তোর ভাই এক মিনিটের জন্য তোকে একা রেখে কাল থেকে যায়নি। আচ্ছা বাবার কথা বাদ দিলাম।আমি এত দূর থেকে তোর জন্য এলাম।
রাফার গাল বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে,বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে অনেক সময় কাঁদে আর বলতে থাকে…আব্বু এবারের মতো মাফ করে দাও।আমি বুঝতে পারিনি,আমি আর কখনো এমন করবো না। কাল ট্যাবলেট খাবার পর খুব কষ্ট হচ্ছিলো,তোমাদের মুখ বার বার ভাসছিলো চোখের সামনে।তখন বাচঁতে ইচ্ছে হচ্ছিলো।ধীরে ধীরে হাত পা অবশ হয়ে যাচ্ছিলো,আম্মু ভাইয়া কাউকে ডাকতে পারছিলাম না।তুমি না এলে আমি চলেই যেতাম বাবা। আমাকে মাফ করে দাও।
আফতাব উদ্দিন মেয়েকে সান্তনা দেন। আর এমন করিস না মা,তোদের কিছু হলে আমরা কি নিয়ে বেঁচে থাকবো।
সেদিন বিকেলেই ক্লিনিক থেকেই রিলিজ করে দেয়া রাফাকে।
বন্ধু,বান্ধবীরা দেখতে আসে তাকে। যে দুই দিন আগে একা কোথাও বের হতে দেয়া হতো না,শাসনে শাসনে রাখা হতো,সেই ঘরের পরিবেশ এক রাতেই বদলে গেছে।
সবার মাঝে রাফার প্রতি ভালোবাসা প্রবল এখন। সপ্তাহ খানেক চলে গেছে এভাবে। ফোন নাম্বার চেঞ্জ করেছে। বাবার দেয়া নতুন ফোনে নতুন সিম। শুধুমাত্র কয়েকজন বান্ধবী ছাড়া আর কেউ নাম্বার জানে না। অবশ্য রাফার আর এসবে আগ্রহ নেই। ফোন পড়ে থাকে বিছানায় দিব্যি। খুব একটা ফোন ধরে না কারো।
নিশ্চুপ বসে রুমের মধ্যে গান শুনছে রাফা। ঘরটা বিষাদের সুরে ভরে গেছে।আফতাব উদ্দিনের আওয়াজ শুনে গান বন্ধ করে রাফা…মা আসবো
জ্বি বাবা আসো…
আফতাব উদ্দিন রুমে এসে বিছানায় মেয়ের পাশে বসে মেয়ের হাত নিজের হাতে রাখেন।রাফার আম্মা পাশে এসে দাঁড়ান। রাফা বলে,বাবা মা তোমরা কিছু বলবে?
আফতাব উদ্দিন বলতে শুরু করেন,তোকে কিছু বলা দরকার তাই বলছি। আমি শুধু তোর বাবা না,একজন বন্ধু ও।
রাফা মা তুমি আমাদের অনেক আদরের সন্তান,আমি চাইলে দেশে থেকে ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করতে পারি কিন্তু বিদেশ কেনো গেছি? তোমরা আরেকটু ভালো থাকবে,তোমাদের কোন ইচ্ছে অপূর্ণ রবে না সেই আশায় আমি তোমাদের ছেড়ে এত দূরে থাকি। তোমাদের প্রতিদিন না দেখে আমার মন ছটফট করে।একা একা কাঁদি তোদের মনে হলে।
রাফার গাল বেয়ে অশ্রু ঝরে।পাশে রাফার মায়ের চোখের কোনে জল শাড়ির আঁচল দিয়ে মোছার চেষ্টা করেন।
আফতাব উদ্দিন বলতে থাকেন,কালকে তোমার চিরকুট পেয়ে তোমাকে হাসপাতাল ভর্তি করি রাতে। সকালে তোমার বড় ভাই শিহাবকে পাঠাই রিফাতের বাসায়। আমরা ওকে চিনিনা তাই সব খবর নিয়ে আসার জন্য পাঠাই। বলে থামেন আফতাব উদ্দিন।
বাবা প্লিজ ওর কথা বাদ দাও,আমি শুনতে চাচ্ছিনা ওর নাম…রাফা চিৎকার করে উঠে।
আফতাব উদ্দিন থামিয়ে দেন,আমার সময় নেই মা,তোর জন্য মাত্র এক মাসের ছুটি নিয়ে এসেছি । আজই সব বলা উচিৎ। তুমি শোনো আগে তারপর বলো।শিহাব ওদের বাসায় যায়,যা জেনে আসে এবং আমার বন্ধু হালিম ওদের চেনে আমি সব খবর নিয়ে দেখেছি,আমাদের পরিবার এর সাথে তাদের কোন মিল নেই,কোন স্টেটাস নেই।তারা রাজনীতির সাথে জড়িত। সেটা অন্যায় কিছু না কিন্তু সেই সাথে তারা কিছু অন্যায় ব্যবসায়,অন্যায় কর্মকান্ড করে তা সব কথা খুলে বলা সম্ভব না। শুধু জেনে রাখো রিফাতের বাবা মা অনেক সময় জেলেই থাকেন। আর রিফাতের ব্যক্তিগত যা খোঁজ নিয়েছি সেও ক্রমশ অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে।তাই এই পরিবারে আমি তোমাকে দিয়ে শান্তি পাবো না মা। তারপর ও যদি তোমার জেদ থাকে তবে আমাকে বলতে পারো বলে ডুকরে কেঁদে উঠেন আফতাব উদ্দিন। রাফা বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আব্বু ভুল একবার করেছি,সেই ভুল আরেকবার হবে না। তুমি চাইলেও আমি সেখানে বিয়ে করবো না। আগে চেয়েছিলাম মনে প্রানে,এখন যা জেনেছি এরপর কোন বিশ্বাসঘাতক বিয়ে করা সম্ভব না।তুমি যা বলবে আমি হাসি মুখে তাই করবো বাবা।
আফতাব উদ্দিন অশ্রু মোছেন হাত দিয়ে…আরেকটি কথা তোমাকে বলতে চাই মা,আমার এক পরিচিত একজনের মাধ্যমে আমি তোমার বিয়ের জন্য পাত্র দেখেছি। ছেলেটি আমেরিকায় থাকে,সেখানকার এক ব্যাংকে জব করে। ওদের পরিবার এবং ছেলের যা খবর নিয়েছি তাতে ঠিক মনে হচ্ছে। কাল সন্ধ্যার পর ওরা আসবে তোমাকে দেখতে,তোমার পছন্দ হলেই কেবল আমরা এগুবো নাহলে না।
রাফা বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,আমার জীবনের অন্য কোন স্বপ্ন ,ইচ্ছে কিচ্ছু নেই,তোমাদের সুখ,হাসি মুখ দেখতে পারাটাই এখন আমার জীবন। ছেলে আমার দেখতে হবে না,আমি তাই করবো তোমরা যা বলবে।
আফতাব উদ্দিন মেয়েকে বুকে জড়িয়ে প্রান খোলে কাঁদেন। বাবা মেয়ের এই বন্ধন দেখে রাফার মা অশ্রু সামলাতে পারেন না।
এক সপ্তাহের মধ্যেই রাফার আকদ হয়ে যায় ঐ আমেরিকান ছেলের সাথে। রাফা কোন কিছু আর ভাবে না,ইচ্ছে অনিচ্ছের হিসেব সে এখন আর করে না। রিফাতকে সে ভুলতে পারে না কারন সেটাই তার প্রথম ভালোবাসা কিন্তু সেই বিশ্বাসঘাতকের চেহারা মনে করতে চায় না।আকদের রাতেই ফোন আসে অপরিচিত এক নাম্বার থেকেই…
কি মনে করে রাফা ফোন ধরে,হ্যালো বলতেই তার সারা শরীর কেঁপে উঠে।
এই তুমি কি করলে?বিয়ে করেই ফেললে?রিফাতের কন্ঠস্বর শুনে রাফার মেজাজ বিগড়ে যায় তবু নিজেকে শান্ত করে বলে,যাক ভালোই বলো,তুমি শুনেছো। আমার নাম্বার তোমাকে কে দিয়েছে জানিনা,শুধু এটুকু বলবো,আজকের পর তুমি কখনো আমাকে কল দেবে না,কারন আমি এখন অন্য আরেকজনের স্ত্রী,আমার আকদ হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।
রিফাত বলে প্লিজ তুমি এমন করো না,চলো আমরা পালিয়ে বিয়ে করি। এ বিয়ে তো তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে।
রাফার রাগ বেড়ে যায়।এই শোনো, আমি নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেছি। আমি কেনো তোর জন্য পথ চেয়ে থাকবো ?এই তোর মনে পড়ে সেদিন রেষ্টুরেন্টের কথা,যখন তোর মোবাইলে অন্য মেয়ের টেক্সট দেখি,তোর সাথে অনেক মেয়ের বাসর রাতের বর্ননা দিয়ে ম্যাসেজ দেখি? যখন দেখি তুই রাত্রি কাটাস অন্যে মেয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়ে,সেদিন কি তোর মনে ছিলোনা আমায়।
রিফাত বলে,হ্যাঁ, আমি অপরাধি।এবারের মতো আমাকে মাফ করে দাও। আমি আর কখনো এমন হবোনা।
কি করে বিশ্বাস করি তোকে রাফা চিৎকার করে।মীম তো আজ বললো তোকে আরেক মেয়ের হাত ধরে বসে থাকতে দেখেছে। আমি কি শুধু ম্যাসেজ দেখেছি,আমি অনেক খবর নিয়েছি,তুই অন্য মেয়েদের নিয়ে মজা করিস,আমাকে নিয়ে টাইম পাস করিস। আমি কত বোকা ছিলাম,তোর মত একটা শয়তানের জন্য মরতে বসেছিলাম কিন্তু জানিস তোকে কোনদিন ভুলতে পারবোনা এটাই সত্য। আবার তোকে কোনদিন ভালোবাসতেও পারবোনা কারন তুই বিশ্বাসঘাতক। আমার স্বামী দেখতে তোর মতো না,এত সুন্দর ও না,একদম পঁচা দেখতে কিন্তু জানিস সে আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে,অনেক কেয়ার করে।
রিফাত এবার সুর পাল্টায় আমি দেখে নিবো কি করে তোরা প্রোগ্রাম করিস,তোকে বিয়ের আসর তোকে তুলে নিয়ে যাবো।
ঘৃনায় লজ্জায় লাইন কেটে দিয়ে কাদঁতে থাকে রাফা। এরকম একটা অমানুষকে কেন যে ভালোবাসতে গেলো। একদিন বিয়ের আয়োজন শেষ হয়। নিজেকে ব্যস্ত রাখে রাফা। স্বামী ফিরে যায় কর্মস্থলে,বাবা ও চলে যায়। আবার একাকিত্ব ফিল করে রাফা কিন্তু স্বামী প্রতিদিন ফোন করে অনেক কেয়ার করে। প্রতি মাসে হাত খরচের অনেক টাকা পাঠায়। আমেরিকা যাবার বন্দোবস্ত করতে থাকে । হয়তো শীঘ্রই চলেও যাবে। পেছনে পড়ে থাকবে শুধুই বিষাদের দিনগুলো।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে রাফা। একটা ঝুম বৃষ্টি দরকার। সব একাকিত্ব,বেদনা ,পেছনের গ্লানি যদি ধুয়ে মুছে নিয়ে যেতো। এক পশলা বৃষ্টি এসে যদি জীবনের সকল নীল বেদনাগুলোকে ধুয়ে মুছে দিয়ে জীবনে একটা নতুন মোড় এনে দিতো তবে বলতাম রাফা তুই সত্যি সুখে আছিস। বড্ড সুখে আছিস পাগলি।

(সমাপ্ত)

নিলয় আহমেদ