ললিতা (৩য় পর্ব)

চারদিকে আলো ফুটতেই ললিতাও ছুটে চলে বস্তির অন্যপ্রান্তে বাস করা মিলনের কাছে,মিলন আর হারিছের খুব ভাব মিল। ললিতা সাত সকালে হন্তদন্ত হয়ে মিলনের বাড়ি এসে মিলনকে ডাকাডাকি করে,সাড়া না পেয়ে দরজায় সজোরে আঘাত করে।
মিলনের বউ এসে দরজা খুলে দেখে ললিতা!
—ভাবী আফনে এত সহালে!
— লুৎফা,মিলন ভাই ঘরে আছে?
— হ,কেরে ভাবী?
— একটু ডাক দেও বইন,আমার ভীষণ বিপদ!
মিলন এর মধ্যেই ঘুম ভেঙে উঠে গেছে, লুৎফা ডাকার আগেই মিলন বিছানা ছেড়ে উঠে আসে।
— কি হইছে ভাবী? কি বিপদ হইছে।
ললিতা কথার উত্তর দিতে পারছেনা, কান্না এসে তার গলাটা আটকে দিচ্ছে।
— মিলনভাই,আফনের দোস্ত গতকাইল বাড়িত আইছেনা! সারা রাত আমি অপেক্ষা করছি কিন্তু আসে নাই। আমারে কোন কিছু কইয়াও যায় নাই।
— ভাবী, কাল সন্ধ্যায় দেখছি হারিছের মনডা একটু কালা কালা। কইছে হে ঢাহা যাইবো গা, এইনো কামাই রোজগার নাই,আফনে কাম করুইন এইডা তার ভাল লাগেনা।
— মিলনভাই, হে ঢাহা গেলে কি আমারে না কইয়া যাইবো? আফনে তারে শেষবার কই দেখছেন?
— মনতলা বাজারে এক রিক্সা গ্যারেজের মালিকের লগে আলাপ করতাছিন, আমারে কইছে, “তুমি যাওগা,আমার দেরি হইবো”
— আমি তারে কই খুঁজবাম অহন?
— চিন্তা করুইন না যে, আইবো।
— মিলন ভাই, আমার সাথে একটু ওই গ্যারেজের মালিকের কাছে যাইবেন?
—অাপনি দাঁড়াইন, আমি আইতাছি।
ললিতা মিলনকে নিয়ে ছুটে গ্যারেজের মালিকের বাড়ি। বাজারের কাছেই উনার বাড়ি। উনার বাড়ি যেতে যেতে সকাল ৮টা বেজে গেছে। উদ্বিগ্ন ললিতা গ্যারেজের মালিকের খোঁজ করলে উনার বউ বেড়িয়ে আসে। ললিতা উনাকে সব খুলে বললে, উনি গ্যারেজের মালিককে ডেকে দেন। গ্যারেজের মালিক রহমান মিয়া জানায় হারিছ গতরাতে তার গ্যারেজে এসেছিল তার পুরনো রিক্সাটা বিক্রি করতে, দরদাম করে রহমান মিয়া ৫হাজার টাকাতে রিক্সা কিনবে বলে কথা ফাইনাল করে আর হারিছও বেচতে রাজি হয়। কথা হয় যে হারিছ আজ গিয়ে রিক্সা দিয়ে টাকা নিয়ে আসবে। তখন প্রায় রাত সাড়ে নয়টা বাজে। এরপরে তো সে বাড়ির দিকেই রওনা দেয়! ললিতা আরও শঙ্কিত হয়! বাড়ির দিকে রওনা দিলে মানুষখান গেল কই? কোন বিপদ হয়নি তো! ললিতা আবার আল্লাহকে ডাকে, “হে আল্লাহ রহমত করো আমারে। ” রহমান মিয়ার বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে আসার পথেই শারমিনের ফোন আসে ললিতার ফোনে।
— হ্যালো ললিতা?
— হ আফা।
— কাজে আসবানা?
— আফা, আমার খুব বিপদ!
— কেন? কি হইছে???
— আফা কাইল রাত থেকে তারে খুঁইজা পাইতাছি না। হে কাইল রাইতে ঘরে আহে নাই।
— তুমি এখন কোথায়?
— মনতলা বাজারে,রিক্সা গ্যারেজের মালিকের বাড়িত আইছিলাম।
— তুমি আমার বাসায় আসো, আমি দেখতেছি।ভয় পেয়ো না।
শারমিনের কথাগুলোতে ললিতার ভিতরটা ঠান্ডা হয়েও যেন হয় না। অজানা ভয় তার ভিতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। এখানে সে একা মানুষ,কিছু চিনেনা জানেনা। কার কাছে যাবে কি করবে কিছুই জানেনা।
মিলন জিজ্ঞেস করে,”ভাবী,আফনে কি ওই বাসাত যাইবেন এখন? আমিও আইতাম?”
— মিলনভাই আমি যাই, আফনে আজ রিক্সা লইয়া যাইয়েন না, আমার ডর লাগতাছে।
— ডরের কিছু নাই,অাল্লাহ আছে না।
ললিতার হাউমাউ কান্নাতে জুবায়ের রান্নাঘরে আসে, দেখে ললিতা কাঁদছে।
শারমিনকে কান্নার কারন জিজ্ঞেস করলে শারমিন হারিছের নিখোঁজ হওয়ার কথা বলে, জুবায়ের দাঁত খিচিয়ে বলে অমন পুরুষ না থাকাই ভাল। ললিতা জুবায়ের আর শারমিনের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকায়। শারমিন বুঝে ললিতা কষ্ট পেয়েছে কথাটিতে। জুবায়েরের দিকে শারমিন চোখ ঘুরায়।
শারমিন ললিতাকে নিয়ে বসার ঘরে যায়, লোকাল থানায় কল করে জানতে পারে গতরাতে কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা থানাতেই আছে এখনো।
ললিতা থানার কথা শুনে শিউরে উঠে,আফা তারে পুলিশে ধরতো কেরে? হে তো এমন কিছু করেনা?
সবসময় যে অপরাধ করলেই পুলিশে ধরবো তা না! অনেক সময় ভুল বুঝেও পুলিশে ধরে নিয়ে যায়। আগে সেখানে যাই,গিয়ে দেখি কি হয়েছে!
শারমিন ললিতাকে নিয়ে থানায় ছুটে চলে, থানার বাহিরে একটা গাছের সাথে হারিছের রিক্সাটা বাঁধা দেখে ললিতার আর বুঝতে বাকি নেই যে হারিছ সত্যিই জেল হাজতে! ভেতরে গিয়ে দেখতে পায় হারিছ সহ আরও ৫জনকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে শারমিন।পুলিশ জানায় গতরাত্রে মাদকসহ তিনজনকে ধরেছে পুলিশ রাত এগারোটার দিকে। হারিছ সেই তিনজনের মধ্যে একজন। ললিতা পুলিশের সামনে ভয়ার্ত কন্ঠে মাথা নিচু করে বলেন,”স্যার বিশ্বাস করেন আমার স্বামী এমন লোক না, এসব সে খায় না। ”
দারোগাটি বললো,”খায়না তাহলে আসলো কোথা থেকে? ”
শারমিন বলে,”স্যার ও তো রিক্সা চালায়। ”
শারমিনকে সম্মান দিয়ে পুলিশ অফিসার বলে,”ম্যাডাম আমাদের মাদক বিরোধী অভিযান চলছে সেটা হয়ত জানেন তাই পুলিশ পরিচালিত অভিযানে যাদের কাছে মাদক পাচ্ছি তাদেরকেই গ্রেপ্তার করেছি। ” শারমিন আরেকটু দৃঢ়তার সাথে হারিছের দিকে আঙুল নির্দেশ করে জিজ্ঞেস করেন কর্মকর্তাকে,”হারিছ নামক ওই লোকটার কাছে কি কোন মাদক পেয়েছিলেন? ”
ওই অফিসার উত্তর দেন, “ওকে অতনু সাহেব গ্রেপ্তার করেছে আমি শিওরলি জানিনা।” অতনু সাহেবের নাম বলতেই শারমিনের কাছে নামটা পরিচিত পরিচিত লাগে। শারমিন অতনু সাহেবকে কখন পাওয়া যাবে জিজ্ঞাসা করলে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন উনার ডিউটি বেলা দুইটায়। এর আগে উনাকে পাওয়া যাবেনা।
শারমিন ললিতাকে নিয়ে থানা থেকে বের হয়ে জুবায়েরকে ফোন করে। দুইবার রিং হওয়ার পর জুবায়ের ফোন ধরে শারমিনকে ঝাড়ি দেয়, “এ ছুটির দিনে কোথায় ঘুরতে চলে গেছো? একটা দিন বাসায় থাকতে পারো না? ” শারমিন কোন কথা বলেনা, সে উত্তর দিলে ললিতা বুঝতে পারবে জুবায়ের কি বলছে তাই সে নিরোত্তর থাকে। জুবায়েরের ঝাড়িগুলো শুনারর পরও শারমিন মাথা ঠান্ডা রেখে জুবায়েরকে শুধায়, “আচ্ছা অতনু নামে তোমার এক বন্ধু ছিলনা, এস আই? ”
— হ্যাঁ ছিল,কেন? তাকে কেন দরকার?
— সে এখন কোথায় আছে?
— অতনু তো এখন এ থানাতেই আছে। আমার সাথে গত সপ্তাহেও দেখা হয়েছে,আড্ডা দিয়েছি। কেন? হারিছ কি জেলেই?
— হ্যাঁ পুলিশ মাদক ব্যাবসায়ী সন্দেহে গতরাতে তাকে আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অতনু নাকি গ্রেপ্তার করেছে।
— এখন তুমি কি করতে চাও? এসব বাজে বিষয়ে না জড়িয়ে চুপচাপ বাসায় আসো।
শারমিন ফোন নিয়ে ললিতার থেকে একটু দূরে সরে আসে,যাতে জুবায়েরের সাথে চলা কথার আঁচ সে না পায় সেজন্য।
— শোন জুবায়ের, ললিতা আমার পরিবারের একটা অংশ। ওর হাতের রান্না খেয়ে বেঁচে আছো,ললিতা একদিন না আসলে না খেয়ে থাকতে হয়। তার প্রতি সামান্য কৃতজ্ঞতাবোধ নেই তোমার?
— আরে টাকা দিলে অমন কত ললিতা এসে রেঁধে দিয়ে যাবে। আর ললিতা কাজ করে আমার বাসায়, আজ ওর যদি কোন অসুখ বিসুখ হতো বা টাকার সমস্যা হতো তাহলে তুমি সাহায্য করতে আমার কোন আপত্তি ছিল না। কি না কি ফালতু বিষয় নিয়ে ছুটছো! এসব ব্যাপারে নিজেকে জড়িয়ে সম্মানটা রাস্তায় নামিয়ে এনো না!
— জুবায়ের, তোমার সম্মান তো দেখছি আকাশ ছোঁয়া! থাক তোমার সাথে তর্ক করার সময় এটা নয়। একজন অসহায় মানুষকে সাহায্য করাটা এখন আমার কর্তব্য আর সেজন্য আমার স্বামী হিসাবে আমি তোমার সহায়তা কামনা করছি, যদি পারো হেল্প কর।
—ঠিক আছে বাসায় আসো, পরে দেখছি।
ফোন কেটে শারমিন দু’দন্ড স্তব্ধ হয়ে থাকে,ললিতা অবাক হয়ে উৎসুক চোখে শারমিনের মুখপানে চেয়ে আছে। আর শারমিন ভাবছে তার স্বামীর মনমানসিকতা নিয়ে। জুবায়ের তো এমন ছিল না?
একটা ছোটখাটো পোস্টে প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করতো সে। শারমিনের বাবাও ওই অফিসে চাকরি করতো। জুবায়েরের ভদ্রতা,শালীনতা আর হাস্যোজ্বল্যতা দেখে তার আরেক কলিগকে দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেন তিনি।জুবায়েরের মত ভাল ছেলে হাত ছাড়া করবেন না বলে শারমিনের পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দেন তিনি। সংসার সামলেও জুবায়েরের প্রচেষ্টা আর শারমিনের একান্ত মনোবলের কারনে শারমিন পানি উন্নয়ন বোর্ডে একটা ভাল পোস্টে চাকরি পায়। এদিকে জুবায়ের শারমিনের বাবার সহযোগিতায় ওই প্রতিষ্টানেই প্রমোশন পেয়ে মোটা অংকের টাকা মাইনে পায়। ধীরে ধীরে জুবায়েরের মানসিকতার পরিবর্তন হতে থাকে। গরীবদের প্রতি তার ঘৃণা কাজ করতে থাকে। শারমিনদের কোন গরীব আত্মীয়কে, এমনকি তার নিজের কোন গরীব আত্মীয়কেও জুবায়ের সহজে জিজ্ঞেস করে না, এ নিয়ে দুজনে প্রায়ই তর্ক করে। কিন্তু আজ শারমিন হিসেব কষে দেখছে আর ভাবছে তার বাবা র পছন্দ করা পাত্র সেই জুবায়ের অার আজকের জুবায়েরের মধ্যে কত তফাৎ!
শারমিন ভাবতে ভাবতে আনমনে হেঁটে চলেছে, ললিতাও তার পিছু পিছু আসছে আর ডাকছে,” আফা,ও অাফা কই যাইন? কি কইলো ভাইসাবে? ”
ললিতার ডাকে সম্বিৎ ফিরে শারমিনের।
— ললিতা তুমি বাড়ি যাও,আমি বাসায় যাই,তোমার ভাইয়ের সাথে গিয়ে কথা বলি,দেখি কি করা যায়।
— আফা আমি বাড়ি যাইতাম না, আমি এইনোই থাকবাম। নাহলে পুলিশরা তারে আবার মারবো। রাইতে মনে হয় মারছে! চোখ মুখ ফোলা ফোলা।
ললিতার দুচোখ ভরে ওঠে কান্নায়, শারমিন দেখে একজন স্ত্রীর কতটা ভালবাসা তার স্বামীর জন্য। জুবায়েরকেও শারমিন এমন প্রাণ ভরে ভালবাসে কিন্তু শ্রদ্ধা? আজকাল জুবায়েরের প্রতি শারমিনের শ্রদ্ধাবোধটা কমে যাচ্ছে।শারমিনের মানসিকতা আর জুবায়েরের মানসিকতার বিস্তর ফারাক তৈরি হচ্ছে আর সেখানেই শারমিন জুবায়েরকে সঠিক শ্রদ্ধা করতে পারছেনা।
—অাফা ভাইসাব কি কইছে? উনি কিছু করতে পারবো?
— ললিতা, তোমার ভাইসাবকে তো জানই রগচটা মানুষ! বাসায় যাই ঠান্ডা মাথায় কথা বলে দেখি। যে দারোগা হারিছরে এরেস্ট করছে সে তোমার ভাইসাবের ছোটবেলার বন্ধু। ভয় পেওনা আশা করি কাজ হবে। নাহলে অন্য ব্যাবস্থা করা যাবে।
— কি করবেন আফা নাহলে?
— ললিতা,তুমি চল তো আমার সাথে?
— কই যামু আফা?
— সামনের দোকানটাতে চা বিস্কিট খাই, চলো। সকাল থেকে কিছুই খাইনি দুজনেই।
— অাফনে খান আফা। আমার গলা দিয়া কিছুই নামতো না অহন।
— অারে এত আবেগী হলে চলে? নিজেকে সুস্থ রাখতে হয় বিপদের সময়, সেটা জানো?
ললিতা আর কথা বাড়ায় না, শারমিনের সাথে চায়ের দোকানে যায়। চা আর বিস্কিট খায় দুজনে।

চলবে……

-অরুন্ধতী অরু