ললিতা (৮ম পর্ব)

অঝোর ধারায় বর্ষা, বাহিরে বের হওয়া অসম্ভব। ললিতা কাজে যেতে পারবে না আজ। ললিতার দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে হারিছের জন্য,এ ঘোর বৃষ্টিতে হয়তো বাড়তি ভাড়া পাওয়ার জন্য ভিজে ভিজে ভাড়া টানবে। হারিছকে অনেকবার ললিতা এজন্য ধমকেছে কিন্তু সে কিছুতেই কথা শুনেনা। প্রায়ই রাতে জ্বরে কাতরায়, সকালে ললিতা বারবার নিষেধ করে রিক্সা নিয়ে বেরোতে কিন্তু জীবিকার টানে তাকে ছুটতে হয় ঝড় বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে।
সন্ধ্যায় ললিতাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা , ললিতার সে কথা মাথাতেও নেই।হারিছ সেটা ঠিকই মনে রেখেছে। বিকেলবেলা বৃষ্টি ছেড়ে রোদের পশলা ছড়িয়েছে চারদিকে। এক জোড়া আনারস কিনে হারিছ বাড়ির দিকে ছুটে,রিক্সাটা উঠানের পাশে আমগাছটায় বেঁধে ঘরে ঢুকে দেখে ললিতা ঘরে নেই।
কাছেই খেলছে কয়েকটা বাচ্চা ছেলেমেয়ে, হারিছ তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করে ললিতারে দেখছে কিনা?
একটা বাচ্চা ছেলে বলছে,”ললিতাবু তো মনে হয় কামে গেছে।”
হারিছ হাতমুখ ধুয়ে আনারসটা কেটে প্লেটে সাজিয়ে রাখে,ললিতা ফিরলে দুজনে মিলে খাবে।
ললিতার তেমন ভাল শাড়ি নেই সেটা হারিছের অজানা নয়। তবুও সেদিন মাস্টার আপার দেয়া পুরনো শাড়িটা হারিছ যত্ন করে ট্রাংক থেকে বের করে রাখে, এটা পড়িয়েই ললিতাকে নিয়ে সে ডাক্তারের কাছে যাবে। হারিছ পথের দিকে চেয়ে ললিতার অপেক্ষা করছে। আজ মাস্টার আপা তাদের সাথে যাবেনা,আপা নিজেই ফোন করে সিরিয়াল দিয়ে রেখেছেন। হারিছই মাস্টার আপাকে এমন বৃষ্টির দিনে কষ্ট করে যেতে নিষেধ করেছে। গত কয়েকমাস ধরে ডাক্তার দেখাতে আসতে আসতে হারিছ এখন এ জায়গাটা বেশ ভাল করেই চিনে ফেলেছে তাই কোন সমস্যা হবেনা বলে সে আত্মবিশ্বাস সঞ্চয় করে।
ললিতার পথ চেয়ে বসে বসে হারিছ ভাবছে আজ আর সে নিজে রিক্সা চালিয়ে যাবেনা, আজ ললিতাকে নিয়ে দুজনে একসাথে রিক্সা ভাড়া করে যাবে। যদিও রিক্সা ভাড়া বাবদ তার অনেকগুলো টাকা গচ্ছা যাবে কিন্তু তাতে কি! দুজন পাশাপাশি বসে কোথাও যাওয়ার মাঝে যে আনন্দ আছে সেটা সে বুঝে যখন কোন স্বামী স্ত্রীকে কিংবা কোন প্রেমিক প্রেমিকাকে রিক্সার হুড তোলে দিয়ে পিছনে বসিয়ে নিয়ে ছুটে চলে তাদের গন্তব্যে তখনই। হারিছ অনুভব করে পিছনে বসা দুটি মানুষ পাশাপাশি বসে কি অনাবিল আনন্দটাই না পায়! আজ সেও এই আনন্দ নিবে। ললিতাকে পাশে বসিয়ে শহরের ল্যাম্পপোস্টের আলোর মধ্য দিয়ে ছুটে চলবে গন্তব্যে, ঝটকা আলোতে তার ললিতাকে আরও সুন্দর দেখা যাবে। হারিকেনের আলো ছেড়ে আজ নিয়ন আলোতে ললিতাকে দেখবে সে।
ললিতা বাড়িতে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা ছয়টা বেজে গেছে, রাগতে গিয়েও আজ হারিছ রাগেনি কারণ হারিছ অনুভব করতে পারছে আবেগ দিয়ে জীবন যতটা সহজ বাস্তবতার কাছে জীবন তার চেয়েও কঠিন।
ভাড়ায় অটোরিক্সা চালানোর পর থেকে হারিছের আয় কিছুটা বাড়লেও প্রতিদিন রিক্সা ভাড়া বাবদ মালিককে ২৫০ টাকা ভাড়া দিতে হয়, ঝড়বৃষ্টির জন্য বিদ্যুৎ না থাকলে রিক্সা চার্জ করতে পারেনা তখন আবার তার আয় বন্ধ থাকে। সম্প্রতি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন পরিবর্তন হয়েছে, সেখানে যে ঔষধ দিয়েছে তার দাম অনেক বেশি, হারিছকে বড্ড হিমশিম খেতে হবে যদি ললিতা বাসায় কাজ করাটা বন্ধ করে দেয়। এরই মাঝে ললিতা আরও একটি কাজ পেয়েছে। গত পরশু মিলন ভাই কাজটার সন্ধান দেয়। রাস্তার মোড়ে স্বাবলম্বী অফিসে নতুন যোগদান করেছে ২৭/২৮ বছর বয়সী এক আপা। ছোট বাচ্চা নিয়ে একাই থাকবেন তাই উনার সাথে রাতে থাকার মত কাজের লোকের সন্ধান করছিলেন তিনি। সেদিন মহিলা বস্তিতে কাজের লোকের সন্ধান করতে আসলে মিলনভাই ললিতার কথা ভাবে।পরদিন সেই মহিলাকে মিলন সঙ্গে করে নিয়ে হারিছের ঘরে আসে। অন্য সময় হলে হয়ত হারিছ কাজ করতে আপত্তি করতো কিন্তু মহিলার তিনবছরের বাচ্চাটাকে দেখাশোনা করলে হয়তো ললিতার মা না হতে পারার কষ্টটা কিছুটা লাঘব হবে। সংসারের বর্তমান টানাটানিটাও হারিছকে বাধ্য করেছে ললিতাকে এ কাজটা করার সম্মতি দিতে। কিন্তু সমস্যা দাঁড়ায় রাতে থাকাটা নিয়ে, হারিছের চরম আপত্তির মুখে ওই মহিলা রাতে না থাকার শর্তেই রাজী হয়। কথা হয় রাতে রহিমাচাচী উনার সাথে থাকবে, রহিমাচাচী এক প্রকার হাফ ছেড়ে বাঁচালেন ললিতাকে।
ঘরে ফিরে হাতমুখ ধুয়ে বিছানার উপরে শাড়িটা দেখে অবাক হয় ললিতা,
— এই শাড়িটা এইনে কেলা রাখছে??
— কে রাখবো আমি ছাড়া?
— শাড়ি বাইর করছো ক্যান?
— আইজকা যে ডাক্তরের কাছে যাইয়াম তুই ভুইল্যা গেছস!
— মনেই নাই!
— এই আনারসটি খাইয়া ল, তাড়াতাড়ি বাইর হইতে অইবো।
— সিরিয়াল পাইবা ডাক্তারের?
— হ মাস্টার আপা সিরিয়াল দিছে ফোন কইরা,তয় আজ আফারে হুদাই কষ্ট কইরা নিমু না লগে। বাইদলা দিনে ভিজে যাওনের দরকার নাই,আমরা দুজনেই চইলা যামু।
— তুমি সব পারবা তো!
— তোর ভরসা হয়না আমার উপরে ললিতা?
— হয় তো, ভরসা না হইলে কি অত বছরের পথ পাড়ি দিতে পারতাছি?
হারিছ একটা তৃপ্তির হাসি দেয়। ললিতা খেয়াল করলো হারিছ আনারসে কাঁচামরিচ টুকরো করে কেটে লবন দিয়ে মাখিয়ে রাখছে । হারিছ জানে এভাবে আনারস খেতে ললিতা খুব ভালবাসে।
— কি ব্যাপার রিক্সা নিবানা?
— না, আইজ অন্য রিক্সা ভাড়া কইরা যামু।
— কতদূর দেখছো নি! কতডি ট্যাহা ভাড়া নিব!
—নেউক ভাড়া, প্রতিদিন কত কত মানুষরে পেছনে তুইল্লা দূরদূরান্তে লইয়া যাই,ওই দুজনরা কত সুখ দুঃখের আলাপ করে খিল খিল করে হাসে আমি খালি প্যাডেল চালাই আর অনুভব করি। আইজ তোরে ওদের মত পাশে বসাইয়া নিয়ে যামু। ঠিক নতুন বউএর মত ললিতা লজ্জায় মাথা নিচু করে।
ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে যখন ঢুকে প্রায় রাত ৮ টা বাজে, ললিতার সিরিয়াল আসতে বেশি বাকি নেই। ২৩ এ তার সিরিয়াল ডাক্তার ১৮ নং রোগী দেখছে। হারিছ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে এটা ভেবে যে তাদের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না। ললিতাকে বসিয়ে হারিছ একটু বাহিরে যায়,এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে কিছু সময় ফিরে আসে, এরই মধ্যে তাদের সিরিয়াল চলে আসে। ডাক্তার ললিতার দুইটা টেস্ট করতে দেয়, চেম্বারের ল্যাবেই টেস্ট করা যায়। ঘন্টাখানেক পর টেস্টগুলোর রিপোর্ট দিয়ে দেয় ল্যাব এসিসটেন্ট। ডাক্তার আজ রিপোর্টগুলো দেখে মুচকি মুচকি হাসছে, ললিতা আর হারিছ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে উনার হাসির কারন জানতে। ডাক্তার সাহেব হারিছকে আস্বস্ত করে মা হতে ললিতার যে সমস্যাগুলো ছিল তা এখন কেটে গেছে। অাল্লাহ চাইলে ললিতার মা হতে আর কোন বাঁধা নেই। হারিছ অবাক হয়, “আগের ডাক্তার যে কইছিল আমার সমস্যা, তাইলে আপনে এইডা কি কইতাছেন যে ললিতার সমস্যা কেটে গেছে!”
“আগের চিকিৎসা যিনি করেছেন তিনি সঠিক সমস্যা ধরতে পারেন নি। ” কথাগুলো ডাক্তার হারিছকে বুঝিয়ে বলে। হাসিমুখে ডাক্তারখানা থেকে বিদায় নেয় হারিছ। অজান্তেই তার মনটা বারবার আনন্দে ভরে উঠছে।
রিক্সা দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হলে হারিছ রিক্সার হুডটা তুলে দেয়। ইলশেগুড়ি বৃষ্টিতে রাস্তার আলোর মধ্য দিয়ে হারিছ বারবার ললিতার মুখখানা দেখছে, আর ঠোঁটের কোণে এক হাসিরেখা ফোঁটে উঠছে। ললিতা ভাবছে সত্যিকার ভালবাসা কত সরল! কত সাবলীল হয় একটা কামনাবাসনাবিহীন ভালবাসাতে। হারিছ কত অল্পতেই ললিতাকে নিয়ে খুশি,কত তৃপ্ত দুজনের চাওয়া পাওয়াগুলি। অথচ জুবায়েরের মত পরনারী লোভী অর্থলোভীগুলো নরম বিছানায়, এসি রুমে রাজকীয় শান্তিতে জীবন কাটাতে পারে, কিন্তু তারা কি সত্যিকার শান্তিটা পাচ্ছে? কোনদিন নৈতিকতার প্রশ্নে সে নিজের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারবে?
রিক্সা চলছে, শহরের জ্যাম,ভীড় গাড়ির হর্ণ আর গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিকে পাশ কাটিয়ে চলছে তাদের রিক্সাটি।
ললিতা এরই মাঝে ভাবছে তাকে শারমিন আপার সাথে দেখা করতে হবে। যেভাবেই হোক শারমিন আপাকে ফিরিয়ে আনতে হবে তার নিজের সংসারে, ললিতা কিছুতেই শারমিনকে হারতে দিবেনা। সেদিন শারমিন যেমন করে ললিতার পাশে দাঁড়িয়েছে আজ তেমন করেই ললিতা শারমিনের পাশে দাঁড়াবে!
ললিতারই বা কতটুকু ক্ষমতা আছে? ক্ষুদ্র অসহায় ললিতা আর কতটুকু করতে পারে? শারমিনকে ফোনে সবকিছু বুঝিয়ে হয়তো ললিতা বলতে পারবেনা তাই সে শারমিনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকে বুঝাতে চায় ফিরাতে চায় তার নিজের সংসারে।
ললিতা আজও জানেনা ঠিক কি কারনে শারমিন জুবায়েরের থেকে দূরে আছে,তবে সে নিশ্চিত কিছু একটা দ্বন্ধ অবশ্যই তাদের মাঝে হয়েছে। শারমিন আপা কি তার স্বামীর কোন বাজে স্বভাব নিয়ে ঝগড়া করেছে নাকি সেদিন হারিছকে ছাড়ানোর ব্যাপার নিয়ে কিছু হয়েছে! যা কিছুই হয়ে থাকুক শারমিন আপাকে যেভাবেই হোক ফিরিয়ে আনতেই হবে।
বড় রাস্তা ছেড়ে রিক্সাটা এখন ছোট রাস্তায় নেমেছে, এ রাস্তাটা ভীষণ অন্ধকার, মনে হচ্ছে যেন মাঝরাত।
— কি রে বউ, এমন চুপ মেরে আছিস যে?
— না চুপ না, ভাবতাছি শারমিন আপার কথা, আমাদের একটা গতি হইলে আপারেও কমু এইহানে ডাক্তার দেখাইতে।
— তারা অত বড়লোক, দেশ বিদেশে চিকিৎসা করে, এই ডাক্তার দেহাইতে আইবো?
— জানিনা অাল্লাহ কার উচিলায় কি করে, তবুও আমি আপারে পরামর্শ দিয়াম এইনে আইতে।
— আইচ্ছা আল্লাহ আমাদের দিকে চায় কিনা আগে দেইখ্যা লই।
— শারমিন আফা কতদিন হয় বাসায় আইতাছেনা, ভাইসাবের সাথে মনে অয় কিছু নিয়া ঝগড়া করছে।
— হাছাই নাকি? আফার সাথে মোবাইলে কথা অয় না তোর?
— হ হইছে তয় এসব কিছু কইছেনা, পাশ কাটাইয়া গেছে হেইদিন।
আমি চাইতাছিলাম নিজে আফার কাছে যাইতে, আফারে ফিরাইয়া আনতে। তার জামাই জীবনেও যাইতো না , এই বেডা অহংকারী, স্বার্থপর।
হারিছও বুঝতে পারছে ললিতা কি চাইছে,শারমিন আপার জন্য তারও বিশেষ সম্মান আছে। জুবায়েরের বাসায় সেদিন যে মহিলাটা আসছে তাতে হারিছের মনেও যথেষ্ট সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

চলবে……

-অরুন্ধতী অরু