ললিতা (৯ম পর্ব)

শারমিন আর ললিতা আজ মুখোমুখি, হারিছের সহায়তায় ললিতা শারমিনের অফিসে এসেছে। ললিতাকে দেখেই বিস্মিত হয় সে,
— “কি ব্যাপার ললিতা তুমি এখানে? কোন কাজে এসেছো? কার সাথে এসেছো?
— হ আফা কাজেই আইছি।
— কি কাজ?? কোথায়?
—এইনেই আর আফনের সাথেই।
শারমিন ভাবছে তার সাথে কি এমন কাজ পড়লো হঠাৎ ললিতার যার জন্য ফোনে কিছু না জানিয়ে সে এতদূর চলে এসেছে! কোন বিশেষ অসুবিধা হয়নি তো আবার!
—আফা আমারে একটু সময় দিতে পারবেন?
— হ্যাঁ অবশ্যই। চলো আমার সাথে।
শারমিন ললিতাকে এনে সিটিং রুমে এসে বসায়। অফিসের ক্যান্টিনে কেক আর চায়ের অর্ডার দিয়ে শারমিন ললিতার পাশে এসে বসে,
—বলো ললিতা, কি এমন কারন যেটা তোমাকে এতদূর নিয়ে এসেছে!
ললিতা অকপটে শারমিনের হাতটা জাপটে ধরে,
—“আফা, অাফনের সংসারে আপনি ফিইরা চলেন। ”
শারমিন বিস্মিত হয়, ললিতা কি এখানে এসব বলার জন্য এসেছে?
—তুমি কি এটা বলতেই এখানে এসেছো?
— হ আপা, আমারার জন্য আপনার সংসার ভাঙুক এইডা আমি হইতে দিমু না।
— তোমার জন্য সংসার ভাঙছে কে বললো, বোকা? তোমার ভাইয়ের সাথে রাগ করেছি, রাগ কমে গেলে এমনিতেই চলে যাবো। তাছাড়া বিয়ের পরে বাবা মায়ের সাথে তো থাকাই হয়না। তোমার ভাইও একটু একা সময় কাটাক,আমার অভাবটা অনুভব করুক।
স্মিত হাসিতে শারমিন কথা গুলো বলে যায়, কিন্তু ললিতার মন বলছে অন্য কথা। কেননা ললিতাই জানে জুবায়ের যে শারমিনের অভাব কতটা বোধ করছে! বরং শারমিনের অনুপস্থিতি তাকে আরও বেশি পর নারীর প্রতি আসক্তি বৃদ্ধির সুযোগ করে দিচ্ছে। এসব শারমিনকে কিছুতেই বুঝতে দেয়া যাবেনা।
— ভাইয়ের সাথে রাগ করে বাপের বাড়ি আছেন বেশ ভাল কথা, এটা আপনারা দুইজনের সম্পর্কের ব্যাপার তয় হেই রাগারাগির কারণ যদি আমরা হই তহন তো আমাদের মইধ্যে একটা অপরাধবোধ জাগ্রত হয়,আমরাও কষ্ট পাই। আমরা আপনার পরিবার ভাঙতে দিমুনা।
— তোমরা কারন হবে কেন আর পরিবার ভাঙবে মানে এটা তুমি কি বলছো ললিতা? কয়েকদিন বাবার বাড়ি থাকা মানে তো পরিবার ভেঙে যাওয়া নয়।
ললিতা নিশ্চুপ থেকে কল্পনা করে সেদিন তার নিজের চোখে দেখা দৃশ্যটা, যে দৃশ্যটা বলে দেয় জুবায়েরের শারমিনের প্রতি সত্যিকার ভালবাসা নেই,যা আছে তা হল বিবাহিত জীবনে দুজনকে পাশে চলতে হবে তাই তারা চলছে। যদি কোন সুযোগ আসে সরে যাওয়ার মত তাহলে জুবায়ের শারমিনের পাশ থেকে সরে যেতে দুবার ভাববে না। ললিতা চায় সমাজের এমন জুবায়েরকে শায়েস্তা করতে, এবং সে এ কাজ করতে পারবে বলে আত্মবিশ্বাসী কিন্তু ঘরপোড়া গরু যে সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পায়!
ললিতা জানে শারমিন স্বাবলম্বী একটা মেয়ে, জুবায়েরকে ছাড়াই সে জীবন পথ পাড়ি দিতে পারবে কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একটা মেয়ের পরিচয় প্রথমে বাবার পরিচয়ে, বিয়ের পর স্বামীর পরিচয়ে। স্বামীর সাথে যদি সম্পর্কের বিচ্ছেদ হয় তখন সে মেয়েটার গঞ্জণার আর শেষ থাকেনা। মেয়েটা চাইলেও সহজে তার বাবার পরিচয়ে ফিরে যেতে পারেনা। বাবার পরিবারে ফিরে গেলেও নানানজনের নানান কটু কথা সহ্য করতে হয় কখনোও বা বাবার পরিবারের গলগ্রহ হয়ে দাঁড়ায় সে।
স্বাবলম্বী হলেও সে মেয়েটা সমাজে একা জীবনপথ পাড়ি দিতে পারবে না,নানান আলোচনা সমালোচনা তার জীবনকে অতিষ্ঠ করতে যথেষ্ট।
অনেক ভেবে চিন্তে দেখেছে ললিতা, শারমিন তার জন্য যে উপকার করেছে বিনিময়ে শারমিনের জীবনটা সে অশান্তিতে ভরিয়ে দিবে? কখনোই না।
অনেকক্ষণ যাবৎ ললিতাকে নীরব থাকতে দেখে শারমিন আবারও কথা বলা শুরু করে, “তোমার ভাইয়ের সাথে রাগ করে বাসায় যাইনা সেটা তুমি কেমনে জানলে?
এ প্রশ্নের উত্তরে ললিতা নিরুত্তোর রইল কারন যে ঘটনার প্রেক্ষাপটে সে শারমিনের বাসায় না যাওয়ার কারন জানতে পারে সে প্রেক্ষাপট বর্ণনা করলে জুবায়েরকে শারমিন দুচোখে দেখতে পারবেনা কোনদিন।
কথাটাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে শারমিন আবারও জিজ্ঞেস করলো। শারমিনও জানে জুবায়েরের স্বভাব কেমন, ললিতার কোন কাজে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে দু চার কথা শুনাতে গিয়ে হয়তো বলে দিয়েছে যে শারমিন হারিছকে থানা থেকে ছাড়ানোর জন্যে তার বন্ধু অতনুর সাহায্য নেয়ার ব্যাপারে তার আত্মমর্যাদা হেয় হয়েছে। আর সেজন্যই রাগে শারমিন বাসা ছেড়ে চলে গেছে।
সেদিন জুবায়ের শারমিনকে অনেক অপমান করে,গাঁজা নিয়ে পুলিশের হাতে ধরা খাওয়া হারিছের জন্য শারমিন জুবায়েরের পরিচয় বিক্রি করেছে। শারমিন নিচু স্তরের মানুষের সাথে মিশে নাকি নিজের স্টেটাস ভুলে যাচ্ছে। জুবায়ের চায় শারমিন যেন তারই মত নিচু স্তরের মানুষের সাথে কম মেলামেশা করে।
এক পর্যায়ে জুবায়ের শারমিনের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে কথা বলে যা ছিল শারমিনের কাছে অসহনীয়। তাই সে রেগে বাসা থেকে বের হয়ে যায়, জুবায়ের একবারও বাঁধা দেয়নি তখন।
শারমিনের বাবার জন্ম হয় নিম্নমধ্যবিত্ত একটা পরিবারে।শারমিনের দাদা দিন এনে দিন খেত। কোনভাবেই শারমিনের বাবাকে পড়াশোনা করানোর টাকা যখন যোগাড় হতো না দেখে শারমিনের দাদী পাশের মেম্বারের বাসায় কাজ করে ৩০০ টাকা মাস পেত, প্রতিদিন দুবেলা খাবার দিত তারা, সে খাবারটুকুও শারমিনের দাদী তার ছেলেকে খাওয়াতো আর নিজেরা সিদ্ধভাত নয়ত শুকনামরিচ ভর্তা করে খেয়ে নিত।
অভাবের সংসারে বেড়ে উঠা সে ছেলেটাকে ডিগ্রী পাশ করাতে ওই দুজন নরনারীর কত যে হিমশিম খেতে হয়েছে!
ডিগ্রী পাশের পরই শারমিনের বাবা অনেক ঘুরে ফিরে একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরি নেয়, যে অল্প বেতন পায় তা দিয়ে সে তার বাবামায়ের মুখের হাসি কিনতে পারতো। ধীরে ধীরে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে ফেলে হতদরিদ্র বাবা মায়ের ছেলে , আজকের শারমিনের বাবা।
শারমিন তার পরিবারের ইতিহাস নিয়ে কখনো লজ্জাবোধ করেনা বরং এটা তার গৌরব।শারমিনের বাবা শারমিনের ছোটবেলাতে প্রায়ই এ গল্পটা বলতেন,মানুষের জীবনে সুখ যে এমনি এমনি আসেনা সে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শারমিনের বাবা অকপটে বলতেন উনার বাবা মায়ের দারিদ্রতার সাথে লড়াই করতে কত যে কষ্ট হতো প্রতিনিয়ত। শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতায় শারমিনের বুক ভরে উঠতো তখন এমনকি আজও তাই হয়।
শারমিনের ধারণা তার দাদা দাদীর অক্লান্ত শ্রমের জন্যই আজ তার বাবা তাদেরকে শিক্ষিত এবং অাধুনিক জীবন দিতে পেরেছে,আজ তারাও স্বাবলম্বী হতে পেরেছে।
জুবায়ের সেদিন বলেছিল,”মানুষের বাসায় কাজ করা মানুষের বংশধর তো তাই কাজের লোকের প্রতি তোমার দরদ বেশি।” কথাটা শারমিনকে প্রচন্ড ধাক্কা দেয়, সইতে না পেরে সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। জুবায়েরের সাথে তার আর কথা বলতে ভাল লাগছিল না।
নীরবতা ভেঙে ললিতা কথা বাড়ায়, “অাফা যাবেন না আমার সাথে? ”
স্মিত হেসে শারমিন ললিতাকে বলে,”অবোধের মত জেদ করো না , তুমি বসো আমি স্যারকে বলে দেখি ছুটি ম্যানেজ করতে পারি কিনা, তাহলে আব্বুকে তোমাকে দেখাতে নিয়ে যাবো।”
ললিতা মুচকি হাসে।
ললিতা ভাবছে শারমিনকে কি তার স্বামীর বিপথগামীতার কোন দিকে ইংগিত দিবে? নাহ্ তাহলে ঝামেলা আরও বেড়ে যাবে।
শারমিনের বাবা ললিতাকে বেশ খাতির যত্ন করেছে,উনি খুব খুশি হয়েছেন ললিতার শারমিনকে ফিরিয়ে নিতে আসার কথা শুনে।
শারমিনের বাবাও শারমিনকে বুঝায় বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য, জুবায়েরের দাম্ভিকতা কারোরই অজানা নয় তাই তারাও আর জেদ করে না।
শারমিনেরও মনটা খচখচ করছে আজকাল জুবায়েরের জন্য।
বাসে ফিরছে ললিতা আর শারমিন, “আফা,একটা কথা কমু?”
— হুম বল।
— ভাইসাবের অফিসের বাছে বদলি হইয়া আসতে পারেন না?
— আসা তো যাবেই! নতুন চাকরি হইছে বদলী হতে সময় লাগবে। মফস্বল এলাকায় আগে চাকরিটা বুঝে নিই তারপরে। এ কথা কেন?
— সংসারটা নাহলে কেমনে দেখবেন? ভাইসাবরে নিজের আষ্টেপৃষ্টে বাঁধতে পারতেন!
—কেন তোমার ভাইজান কি এখন মুক্ত নাকি!
শারমিন নীরব হয়ে যায় এ কথার শেষাংশে।
ললিতা জানে জুবায়ের শারমিনের অনুপস্থিতিতে তার অফিসের একটা মেয়েকে বাসায় আনে। মেয়েটার সাথে বাসায় থাকলেই ফোনে কথা বলতেও দেখেছে ললিতা।
সেদিন যখন গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে ললিতা কয়েকজনের সাথে গল্প করছিল তখন লুৎফাভাবীর মুখে শুনে জুবায়েরের বাসায় খুব সুন্দর একটা মেয়ে এসেছে, “ললিতাবু, তুমি ঐ বাসায় কাম করতে যাও না? ”
— হ যাই কেরে?
— জানোনা কি সুন্দর একটা মাইয়া আইছে ওই বাসায়।খুবই সুন্দর মাইয়াডা!
ললিতার মনে প্রশ্ন জাগে কে সে? তাকে দেখতেই হবে। হারিছও বলেছে তার রিক্সা করেই মেয়েটা এসেছে। একছুটে ঘরে গিয়ে ললিতা শারমিনের ফ্ল্যাটের চাবিটা নিয়ে আসে, যদি প্রয়োজন হয় সে ভেতরে ঢুকবে।
ধীর পায়ে গেইটের তালা খুলে দেখে দরজা ভেতর থেকে লক করা ছিল। ললিতা রান্নাঘরের দিকের দরজা যে খোলা রেখেছিল সেটা মনে পড়ে গিয়েছিল।কিচেনের দিকের দরজা দিয়ে ললিতা শারমিনের বেডরুমে উঁকি দিয়ে যা দেখেছিল তার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। একদম চুপচাপে কোন সাড়াশব্দ না করে সে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেদিন। ললিতা নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছিলনা, জুবায়ের নীচ কিন্তু এতটা নীচ হবে সে কল্পনা করেনি কিন্তু কিছুটা আন্দাজ করেছিল যখন সে বাথরুমে কিছু আপত্তিকর জিনিস পেয়েছিল। এই জুবায়ের আবার ললিতাকে বিয়ের কথাও বলে, কতটা নোংরা সে!

চলবে…

-অরুন্ধতী অরু