সম্পর্ক

পাকা চুলগুলো ঘোমটার আড়াল থেকে উঁকি দেয়। লালবাগ কাজী অফিসে বসে আছে মহুয়া।সাথে এসেছে অর্ক…. আত্মজ। শীত নেই বললেই চলে।আজকাল ঢাকাতে শীতের দেখা পাওয়া দুষ্কর।

মহুয়া ঘামছে। বাবলা এলো বেশ দেরীতে। না একা আসেনি বাবলা। মিজানকে সাথে নিয়ে এসেছে… ছোটবেলার বন্ধু।
কাজী সাহেব একটা বিয়ে পড়াতে ব্যস্ত।
মহুয়া আরেকবার ভাবো… মিজান অনুরোধে বলে।বাবলা মহুয়ার দিকে তাকিয়ে….

অর্ক মা কে জড়িয়ে ধরে। মা তোমার মন যা বলে,তাই করো।
মহুয়া ঋজু ভঙ্গীতে উঠে দাঁড়ায়। সিদ্ধান্ত পাল্টাবে না আমার!
গতকাল মহুয়ার শেষ বাঁধন বাবা চলে গেছেন। মা গেছেন আরো আগে। এই দিনটির জন্য এতগুলো বছর অপেক্ষা করেছে মহুয়া।

লেখাপড়া শেষ করে ভালবেসে বিয়ে করেছিল বাবলাকে। বছর ঘুরতেই কোল জুড়ে এলো অর্ক। মেঘলাকে বিয়ে দিয়েছে গেলো বছর। মেঘলা দেশে নেই।
বাবা মার পঞ্চম সন্তান মহুয়া। সাত ভাই বোন। কিন্তু বাবা মা মহুয়ার কাছেই থাকতো।
সংসার,সন্তান,বাবা মা…মহুয়ার জগৎ।
বাবা মা সাথে থাকেন,মহুয়ার কৃতজ্ঞতা শেষ হয় না বাবলার কাছে। বাবলার পুরো পরিবার টেনে চলে মহুয়া। টেনে চলে বাবলার খামখেয়ালী ঔদ্ধত্য।
একেকটা দিন পার করেছে মহুয়া জীবনের দামে…..
বাবলার সকল কিছু মনে না নিলেও মেনে নিয়েছে অবলীলায়। কত ক্ষরণে ঝরে পরে মহুয়া…. কেউ জানেনি,কেউ বোঝেনি। আজকাল আর কোনো ক্ষতে লাল নেই… গভীরতম দাগে বিঁধে আছে বেদনার নীল।

এই দিনটি আসবে একদিন… দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছে মহুয়া। অবশিষ্ট আবেগের লাগাম টেনে নিয়েই মহুয়া আজ লালবাগ কাজী অফিসে।
একদিন এখানেই শুরু হয়েছিল যুগল চলা। কাজী সাহেব এলেন।
… আপনারা চিন্তা করেছেন তো! ডিভোর্স হবার পর তিনমাস….
মহুয়ার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। বছরের পর বছর অপেক্ষা আজ শেষ হবে।
পঁচিশ বছরের বিয়ে নামক ফাঁস… নেমে যাবে কলমের খোঁচায়।
যে সম্পর্ক কাগজের… যে সম্পর্ক দেনা পাওনার…. যে সম্পর্ক দম বন্ধ করে দেয়…. তার সাথে আর দেখা হোক,চায় না মহুয়া।
পঞ্চাশ বছরের এক নারী মুক্তিকামী এক রমণী হয়ে ওঠে।
কাগজ কলমের সম্পর্ক ঠুনকো কাঁচের মত!
রেশমী চুড়ির মত….

অর্ক মাকে নিয়ে বাহিরে আসে। ব্যস্ত শহরের মানুষেরা…. কে কার খবর রাখে! মহুয়া অর্কের হাত ধরে হাঁটছে…. পাকা চুলগুলো উঁকি দেয় ঘোমটার ফাকে!
…. আজিমপুর গোরস্থানে ঘুমিয়ে বাবা মা। বাবা মা মহুয়াকে মুক্ত করে গেছে। মহুয়ার খুব ইচ্ছা করে, খুউব…. বাবা মাকে জড়িয়ে ধরে একটু কাঁদতে….

-ফারহানা নীলা