সার্কাস ( ৩য় পর্ব )

ভয়াবহ জ্বরের ঘোরে তিনদিন পার করে চতুর্থ দিনে হীরা বিছানায় উঠে বসল। শরীর অনেক দুর্বল। ভর দুপুর,পার্টির লোকজন এসময় খেয়ে ঘুমায়,কার্ড খেলে। হীরার আশপাশ কেমন নিরব সারাশব্দহীন। দরজার দিকে তাকিয়ে কড়া রোদ চোখ ধাঁধিয়ে দিল তার। যেন সব রোদ চোখে ঢুকে পরেছে। হীরা ক্ষীণ স্বরে ডাকল,

‘সুশান্ত….’

সার্কাসের জোকার বামুন ‘হাক্লা’ ঘরে ঢুকে বলল,

‘আম্মা, কিছু কইবেন?’

‘সুশান্ত কই হাক্লা? ওরে ডাক’

‘হেরে পাইবেন না আম্মা। জব্বর পিটুনি দিয়া দুইদিন বাইন্ধা রাইখা গত কাল খালেক ওরে ছাইড়া দিচ্ছে। বেচারায় অনাহারে থাইকা মরে মরে অবস্থা! ছাড়া পাইয়া চইলা গেছে। কিছু চাইলে আমারে কন।’

হীরার কিছুই মাথায় ঢুকলো না প্রথমে। পরে সব মনে হলো। বুকের ভিতর কোথাও একটা চিকন কষ্ট অনুভূত হলো। হীরা কিছু বলল না। চোখ বন্ধ করে ফেলল। আলো চোখে খুব লাগছে।

শুক্রবার সার্কাস শো বন্ধ থাকে। অনেক রাত অবদি অপেক্ষা করেও হীরা ফয়েজ চৌধুরীর ধরা পেলনা। প্রায় মায়ের বয়সি ফয়েজ চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী মেরির মা হীরার কাছে শুতে এলো। সম্পর্ক যাই হোক প্রচন্ড রকম মমতাময়ী এই মহিলার সংস্পর্শ হীরার খুব ভাল লাগে।
এত মায়ায় ভরা একজন মানুষ কি করে নি:সন্তান হতে পারে এ সংসারে ? মাঝে মাঝে মনে হয় বিধাতার নিষ্ঠুরতাও কত নিশ্চুপ অথচ সীমাহীন হয়!

মাথায় চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মিরার মা বলল,

‘সেদিন কি হইছিল,ভয় পাইছিলা ক্যান?’

হীরা নিজের মনে ভাবে,এমন কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে কেন সে ভয় পেয়েছিল? সেই ভয়ঙ্কর মুখটা এখনও তার সামনে স্পষ্ট। কি অদ্ভুত জন্তুুটা।

হীরার সব কথা শুনে মিরার মা হাসে। মনের ভুল ‘বলে শান্তনা দেয়। অল্প বয়সে প্রথম বাচ্চা পেটে আসলে এসব উদ্ভট চিন্তাভাবনা মাথায় আসে। এতে ভয় পাইতে নাই বললেও হীরা তার পছন্দের মহিলার কথায় আশ্বস্ত হতে পারেনা বিন্দু মাত্র।

কিন্তুু ভয় পাওয়ার ব্যাপারটা মাথা থেকে একেবারে উড়িয়ে দিল মিরার মায়ের পরের কথাগুলো। হীরা হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করল,
‘আপনি তার কথা শুনলেন?’

‘না শুইনা উপায় কি? তার মনে হইছে আমার পেটের বাচ্চাডার বাপ সে নয়!’

‘আপনি তার এমুন কথা শুইন্যা বাচ্চাডারে নষ্ট করলেন?’

‘আমি জাইনা শুইন্যা করি নাই। সে এক রাতে আমারে একখান অসুধ খাওয়াইলো মিছা কতা কইয়া। কইল, ডাক্তারে দিছে বাচ্চার সুস্থ থাকবার জন্যে। আমি তারে বিশ্বাস কইরা খাইলাম’

হীরা অবাক হয়ে মেরির মায়ের মুখের দিকে চাইল। মেরি নামের তিন বছরের কন্যা সন্তান সহ তার নেশারু স্বামী তাকে ফয়েজ চৌধুরীর কাছে বিক্রি করেছিল সামান্য টাকায়। তখনও কি সে এমন করেই হাসতে হাসতে মেনে নিয়েছিল সব!

আবার বলতে লাগলো মিরার মা, ‘পরের দিন শরীর থেইক্যা রক্ত পড়তে পড়তে মরতে বসিছি, ডাক্তারে আমার জরায়ু ফালাইয়া দিয়া আমারে বাচাঁইলো।’

হীরার বিস্ময়ের এখনও বাকি ছিল। মেরির মা তারপর যা বললেন, তার জন্য সে রেডি ছিলনা।

‘হীরা, তুমি এমুন ভুল করবা না। আমার আচঁলে তোমার জন্যও অসুধ বান্ধা।আমারে কইছে তোমারে মিছা কতা কইয়া খাওয়াইতে। মিরার মা দীর্ঘনি:শ্বাস ছেড়ে আবার বলল,
‘নিজেরে কলঙ্কিত করবা না। বাচ্চাডারে দুনিয়ায় আাইনা প্রমান করবা, এইডা তারই বাচ্চা’

হীরার মেরীর মায়ের বুকের মধ্যে ঢুকে গেল। তাকে গলা ছেড়ে কাদঁতে হবে। কিছু কাঁন্না গলা ছেড়েই কাদঁতে হয়। নইলে বুকের মধ্যে ব্যাথা হয়ে জমে থাকে।

ফজরের আযানের আগে মেরীর মা হীরাকে ডেকে তুলল। এমন জঙ্গলা জায়গায় একা একা টয়লেটে যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। পাট বসিয়ে অস্থায়ী একটা টয়লেট বানানো হয়েছে তাদের জন্য। বাশঁঝাড়ের ভিতর দিয়ে একটা বড় জলপাই গাছের নিচে যেতে হয়। রাতে বিরাতে টয়লেটে যাওয়া বড় বিপদজনক । হাতে টর্চ নিয়ে হীরা মেরির মায়ের পিছনে হাঁটতে থাকল। টর্চ জ্বালিয়ে টয়লেটের দরজার তালা খুলে হাতে নিয়ে জলপাই গাছের নিচে দাড়াল হীরা।

টর্চের আলো ফেলে মাঝে মাঝে চারদিক একবার দেখে নেয় সে। আনমনে দাঁড়িয়ে থেকে সন্ধ্যারাতের কথায় মনটা ভরে আসে আবার তার। বারবার চারপাশে আলো ফেলতে যেয়ে হঠাৎ লক্ষ করে সে অনেক পাকা জলপাই গাছের নিচে পড়ে আছে। দূরে কোথাও শুকনো পাতায় পা ফেলার শব্দে বুকের ভিতরাটা কেপেঁ উঠল তার । হীরা আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে মরে যাওয়া এক ফালি চাদঁ কালছে মেঘে ঢেকে আছে। বাশঁঝাড়ের কারনে সে মরা আলো জঙ্গলের ফাঁক ফোকর গলিয়ে তেমন ঢুঁকতে পারেনি। জায়গাটা বেশ ভয় লাগানো অন্ধকার হয়ে আছে। আবারও কাছে কোথাও ঘোত ঘোত টাইপ শব্দ হলো।

হীরাকে চমকে দিয়ে মেরির মা টয়লেটের দরজা খুলল তখনি । টিনের ক্যার ক্যার শব্দ জায়গাটাকে একরকম জাগিয়ে দিল।
‘তুমি যাবা টয়লেটে হীরা? গেলে যাও, আমি আছি এহানে’

হীরা কিছু না ভেবে টয়লেটে ঢুঁকে গেল। মিনিট পাঁচেক পরেই দরজা খুলে বেড়িয়ে হীরা দেখল, মেরির মা জঙ্গলের দিকে মুখ করে উবু হয়ে জলপাই কুঁড়োচ্ছে।
হীরা হাসতে হাসতে বলল,

‘আমি বলতে চাইছিলাম আপনেরে, অনেক পাকনা জলপাই নিচে পড়ছে। খুটায়া নিমু যাবার সময়’

মেরির মা চুপ করে রইল। হীরা মেরির মা’কে অনুসরন করে জলপাই কুড়োতে মন দিল।

‘আপা, লাইটা একটু জ্বালান,কিছু দেখা যায়না তো’

এবারও মেরির মায়ের কোন সাড়া পাওয়া গেল না। হীরার কাছ থেকে মেরির মা কিছুটা দূরে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে। হীরা আবার বলল,

‘ ওত দূরে যাইয়েন না। জঙ্গলে ঢুঁকে যাচ্ছেন ক্যান?’

মেরির মা এবারও চুপচাপ তেমনি উবু হয়ে জলপাই খুঁজতে লাগল। হীরা এবার দাঁড়াল, বলল,

‘আসেন আপা, আর লাগবে না জলপাই । চলেন যাই’

হীরা কিছুটা অবাক হল, মেরির মা কথা বলছে না কেন?সে এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে মেরির মায়ের হাত ধরল। সঙ্গে সঙ্গে যে মানুষটি দাড়াল তার সামনে, আবছা আলোয় তাকে দেখে হীরা ছিটকে দু’হাত সরে গেল। কি কুৎসিত চেহারা! কি বিভৎস মুখ! এ তো সেই বৃদ্ধ লোকটা, যার চোখ দুটো সেদিনের মতই অন্ধকারে জ্বলছে।

ঘটনার আকস্মিকতায় হীরা স্তব্ধ হয়ে দাড়াল। হৃৎপিন্ড উঠে গলায় আটকে গেছে যেন।

সে বলল,’ এই আপনে কে?’
বলেই বুঝতে পারল তার গলা দিয়ে কোন কথা বের হয়নি। সে নিজের কথা নিজেই শুনতে পায়নি।

জন্তুটার সরু লম্বা লিকলিকে পা তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার ছুটে পালানো দরকার কিন্তুু হীরা জমে গেছে, এক চুল পরিমান তার পা’কে সে নাড়াতে পারল না।
বুকের কোথাও থেকে চিৎকার ছিটকে বেড়িয়ে এলো-

‘আমার দিকে আসেন ক্যান? যা, যাহ্….’

জন্তুুটার বিভৎস শরীর হীরার শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়ল কিছু বোঝার আগেই।

-বেলা প্রধান