সেই লোকটি

ডক্টর দেখিয়ে ফিরতে রাত প্রায় বারোটা বাজলো।আমি আর সিঁথি গিয়েছিলাম। সিঁথি আমার বান্ধবী। আমরা কাছাকাছি বিল্ডিং এ থাকি। সিএঞ্জিওয়ালার কাছে ভাংতি টাকা নেই। আমাদের কারো কাছেই নেই। এক মুশকিলে পড়া গেল। বিল্ডিং এর নিচে চেয়ার পেতে কয়েকজন লোক বসেছিলেন। হয়তো কমিটির কেউ হবেন। একজন এগিয়ে আসলেন। বললেন কি সমস্যা! ভাড়ার ব্যাপারে তিনি সাহায্যের হাত বাড়ালেন। লোকটিকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে আসলাম। যাওয়ার আগে পাঁচশত টাকার নোট তাকে ধরিয়ে দিয়ে আসলাম। বললাম আমি পাশের বিল্ডিংএ থাকি ফ্ল্যাট নাম্বার ৩০৩। সময় করে বাকিটা পৌঁছে দিয়েন। বাসায় শাহেদকে ঘটনাটি বললাম। শাহেদ বলল তুমি কি লোকটিকে চেন? বললাম দেখলে চিনবো। নাম জানো? নাতো! শাহেদ হাসলো। আমার গা জ্বলতে লাগলো। কারন শাহেদের এই হাসির অর্থ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা বোকা। তারপরেও বললাম হাসছো যে!

এমনি কিছু না। তোমরা মেয়েরা বেশ সরল মনের। মানুষকে সহজে বিশ্বাস করো। হ্যাঁ তা করি। বিশ্বাস করে ঠকার আনন্দ অপরিসীম। যেমন তোমাকে করেছিলাম। শাহেদ এবার চুপ মেরে গেল। বুঝলো ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে।

এর দুইদিন পরের ঘটনা। অফিস থেকে ফিরতে দেখলাম পাশের বিল্ডিং এ একটা বড় ব্যানার ঝুলছে। লিখা আমরা শোকাহত। ছবি সহ মৃত ব্যাক্তির নাম লিখা। ছবি দেখে আমি আতকে উঠলাম। আরে! এতো সেইলোক। যিনি সিএঞ্জির ভাড়ার ব্যাপারে সাহায্য করলেন। কিভাবে মারা গেলেন!

রাতে শাহেদকে বললাম শুনছ লোকটি মারা গেছেন। কোন লোক? ঐ যে সিএঞ্জি ভাড়া দিল। তাই! কি হয়েছিল? জানিনা। লোকে বলাবলি করছে হার্ট এটাক। হুম তারমানে লোকটির হার্ট ছিল। মানে! মানে কিছু না। হার্ট থাকলেই হার্ট এটাক হবে। এটাই স্বাভাবিক। মশকরা করার আর সময় পাও না! আরে আমি কি বললাম! শোন তোমার পাওনা টাকা পরিশোধ করেছিল? না করেনি। শুনলাম পরেরদিনই হার্ট এটাক হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। হুম। কত যেন পাও! তিনশত পঞ্চাশ টাকা! দাবী রাইখো না। মাফ করে দিও। দুই ধরণের লোকের আত্মা ভয়াবহ হয়। এক সৎ লোক আর বদ লোক।শাহেদের এই কথার পর থেকে মাথায় ঘুরছিল লোকটির কথা। দেখে অনেক ভদ্র আর মার্জিত মনে হয়েছিল। খুব বেশিতো বয়স হওয়ার কথা না। কিছু মানুষ আছে যাদের দেখলে বা কথা বললে বুঝা যায় ভালো মানুষ। কে জানে ভালো মানুষ বলেই হয়তো তাড়াতাড়ি চলে গেলেন।

আজ শরীরটা বেশি ভালো লাগছে না। মাথা ব্যথা। প্রেশারটা চেক করাতে হবে হয়তো। অফিস থেকে ছুটি নিলাম। বাসায় শুয়ে বসে কাটাচ্ছি। বাচ্চারা স্কুলে। শাহেদ অফিসে। ঘুরে ফিরে লোকটির কথাই বারবার মনে হচ্ছে। কেন জানি ভালো লাগছে না। দরজায় টুকটুক শব্দ হলো। অনেকে আছেন কলিং বেলের সুইচ দেখতে পান না। দরজায় নক করেন। প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে এসে দরজা খুলে কাউকে পাওয়া গেল না। তারমানে এটা ভুল কিছু ছিল। মনের ভুল। কিছুক্ষণ পর আবার টুকটুক শব্দ। এবারও কাউকে পাওয়া গেল না। কেউ কি দুষ্টুমি করছে! আমি এরপর আর শোবার ঘরে ফেরত গেলাম না। দরজার আই হোলে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইলাম। কারণ আমি স্পষ্ট বুঝেছি এটা আমাদের দরজায় কেউ করছে। এবার শব্দ হওয়া মাত্র আমি ধরাম করে দরজা খুলে দিলাম। আর সেই সাথে দেখলাম একটি লোক টাকা হাতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই লোকই সেই লোক এটা বুঝতে আমার তিন সেকেন্ড সময় লাগলেও জ্ঞান হারাতে একটুও সময় নিলাম না।

জ্ঞান ফিরলে দেখলাম শাহেদ আমার মুখের উপর ঝুঁকে আছে। কি যেন বলছে আমি বুঝতে পারছি না। কিন্তু শাহেদের ঠিক পেছনেই সেই মৃত লোকটা টাকা হাতে দাঁড়িয়ে। আমি আবার অতলে তলিয়ে যাচ্ছি। আমি কি জ্ঞান হারাচ্ছি!এরপর যতবারই চোখ মেলেছি। সেই মৃত লোকটিকেই দেখেছি টাকা হাতে।

হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। আজ রিলিজ দিল। শাহেদ আজ অফিসে যায়নি। এ’কদিন খুব দৌড়ঝাঁপ করেছে আমাকে নিয়ে। বাচ্চাদের সামলেছে। আমি ঝিম মেরে বিছানায় শুয়ে আছি। বারান্দায় বিকেল পড়ে এসেছে। শাহেদ আমাকে ড্রইং রুমে নিয়ে গেল। বলল আসো দেখে যাও। ভয়ের কিছু নেই।

আমি ড্রইং রুমে দেখলাম সেই লোকটি বসে আছেন।হাতে টাকা। আমাকে দেখা মাত্র উঠে দাঁড়ালেন। বললেন আপা আমি খুবই দুঃখিত পুরো ঘটনার জন্য। আমার নাম শফিকুল ইসলাম। যিনি মারা গেছেন তিনি আমার ভাই রফিকুল ইসলাম। আমরা টুইন। এই নিন আপনার টাকা। বলে তিনি তিনশত পঞ্চাশ টাকা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

-জামান একুশে