হুলো ( ৩য় পর্ব )

তিনদিনে পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক হল। রাহেলার চার ছেলেমেয়ে হুলোকে হারানোর ব্যাপারটার কিছুটা হজম করে ফেলেছে। সেদিন স্কুল থেকে ফিরে রাজু সব শুনে রাগ করে পুরো একদিন দানাপানি মুখে নিলনা। রাহেলা বুঝিয়ে সুঝিয়ে দ্বিতীয় দিনে ছেলেকে খাইয়েছেন এই শর্তে যে, রাজু আবার হুলোকে খুঁজে আনবে।’

আজ সালাউদ্দীন অফিস থেকে ফিরতে গিয়ে বাজারে ঢুকলেন। মাছ বাজারে গিয়ে টাটকা ইলিশের দিকে তাকিয়ে তার লোভ হল। মনের অনেক দ্বিধাদ্বন্দ  ফেলে অবশেষে তিনি চারশো টাকায় একটা ইলিশ কিনে ফেললেন। এত বড় একটা ইলিশ হাতে নিয়ে তিনি বাসায় ফিরছেন ভেবে মনে চাঁপা আনন্দ হলেও ঠিক করলেন, বাসায় গিয়ে ইলিশের দাম চারশ টাকার কথা বলাই যাবেনা। রাহেলা জানলে মুখ ভার করে ফেলবে। তারপর সময়মত খোচাঁ দিয়ে বলবে,

‘চারশ টাকায় ইলিশ কিনতে পার, আর সংসারের প্রয়োজনে দুশো টাকা দিবেনা কেন?’

তখন তার বলার কিছু থাকবে না। তার সংসারে চারশো টাকা অনেক কিছু। তার অফিসের প্রডাকশন জি. এম স্যার যদি এমন মাছ কেনে প্রত্যেকদিন সেটা মানাবে, তার মাসে একটা কেনাও মানায় না। জি এম স্যার পুরোপুরি মূর্খ একটা লোক, বেতন পায় দেড় লক্ষ টাকা, চিন্তা করা যায়? আর সে গ্রাজুয়েট কমপ্লিট করা মানুষের বেতন মোটে বারো হাজার টাকা! অথচ কাজ সে জি. এম স্যারের চেয়ে বেশি করে। জি এম স্যার আছে সারাদিন একটা ল্যাপটপ নিয়ে এসি রুমে বসে, আর তার ছুটোছুটি করে জান কাহিল। কোন শালার পুতে যে এমন নিয়ম করে গেছে! শালারে ধরা পেলে থাপড়ায়া দাতঁ ফেলে দিত সে। পাছায় উড়ে গিয়ে এমন লাত্থি মারত, ছিটকে দশ হাত দূরে পড়তো!শালার পো শালা.. নিয়ম তোর পাছায় ঢুকাতাম!

মনে মনে এমন চাপাঁ রাগ নিয়ে সালাউদ্দীন বাসায় ফিরে রাহেলার হাতে মাছ ধরে দিয়ে হরহর করে বললেন,

‘কচি মূলা বেগুনে ইলিশের ঝোল রান্না করবা সাথে পটল ভাজি মুগের ডাল।
বুঝলা,মাছের বাজারে গিয়া ইলিশের দোকানের সামনে চোখ বন্ধ করে পার হয়ে যাই সবসময়। আজ হ্যাচকা দামে পেয়ে গেলাম। তুমি চিন্তা করতে পার, এত বড় একটা ইলিশ মাত্র দুশো টাকা? অবশ্য এক মাছে দুশো টাকা খরচ করাও ঠিক হয়নাই, বোকামী হইছে । তবুও ভাবলাম, ছেলেমেয়েদের জন্য এক আধ দিন বোকামি করাই যায়। তাছাড়া আত্না শান্তি করে খাওয়ার একটা ব্যাপার আছে কি না বল ? কি হবে, সব তো থুইয়াই যাইতে হবে। যাবার মধ্যে যাবে তো এই আত্নাটাই। ‘

দুপুরে মনে তৃপ্তি নিয়ে খেতে বসেছেন সালাউদ্দীন, রাহেলা সামনে বসে আছে। তিনি তাকে বললেন,’তুমিও থালা নাও, ছেলেমেয়েরা তো কেউ নাই, একসাথে দুইটা খাইলা…
রাহেলা স্বামীর কথায় গুরুত্ব দিল না। ছেলেমেয়েদের না নিয়ে তিনি একা খেতে পারবেন না।

মনযোগ দিয়ে স্বামীর কথা শুনছেন। লোকটা কথা বেশি বললেও তার শুনতে ভাল লাগে। সালাউদ্দীন গল্প করছেন ফাঁকে ফাঁকে ভাতের বড় বড় লোকমা মুখে নিচ্ছেন। বুঝলা বউ, ‘নতুন সংসার সেলিম সাহেবের। বুড়া বয়সে একটা কচি মেয়ে বিয়ে করেছেন। বাজারে গিয়া হাত ভরে বাজার করার পরে সঙ্গে দুইটা ইলিশ কিনলেন । বাজার থেকে বাড়ি ফেরার রাস্তা সামান্যই। রিক্সায় দশটাকা, গাড়িতে দুই টাকা। সেলিম সাহেব দশ টাকা বাচাঁতে গাড়ি ধরতে গেলেন। যখন তিনি গাড়ির কাছাকাছি এলেন, তখনি গাড়িটা ছেড়ে দিল। সেলিম সাহেব ঝাঁপ দিয়ে ইলিশ ধরা হাতে গাড়ির গেটের পাশের লোহার হ্যান্ডেল চেঁপে দৌঁড় দিলেন। ভাবলেন দৌঁড় দিতে দিতে গেটের উপর লাফ দিয়ে উঠে যাবেন। খানিকটা পথ দৌড় দেবার পর দেখলেন গাড়ির হ্যান্ডেল তার হাতে রয়ে গেছে, আর গাড়ি তাকে ফেলে বেশ দূরে চলে গেছে। হ্যান্ডেলের দিকে তাকিয়ে তার মনটা খারাপ হওয়ার বদলে ভাল হয়ে গেল কেন বলতো?

রাহেলা কারণটা ধরতে পারলেন না। লোকটার গল্পের মাঝে এমন প্রশ্ন করে তাকে সবসময় বোকা বানান। তবুও স্বামীর খুশি খুশি মুখের দিকে তাকিয়ে গল্প শুনতে বেশ ভাল লাগে তার । লোকটা সবসময় গল্প করেন না। মন ভাল থাকলেই এইসব মজার গল্প করেন।

সালাউদ্দীন ভাত মুখে হেসে বললেন,

পারলে না, তাইনা? আরে, সেলিম সাহেব লক্ষ করে দেখলেন যে, সে গাড়ির হ্যান্ডেল ধরে দৌঁড়েই বাড়ীর কাছে পৌঁছে গেছেন। মনে মনে খুশি হয়ে ভাবলেন, যাক, টাকা দুইটাও বেঁচে গেল।কিন্তুু গাড়ির পিছনে দৌঁড়ে চলে আসার ব্যাপার মনে করে তার বারবার হাসি আসতে লাগল। যখনি মনে পড়ে তখনি তিনি হাসেন মনে মনে ।

বউ কাজের ফাঁকে ব্যাপারটা লক্ষ্য করল। অনেক সাধাসাধিতে সেলিম সাহেব ঘটনাটা বললেন। বউ শুনে হাসতে হাসতে বলল, ‘গাড়ির পিছনে এত জোরে দৌঁড়ে দুইটাকা বাঁচালে, রিক্সার পিছনে দৌঁড়ালে তো এত জোরে দৌঁড়াতে হত না, টাকাও বেশি বাচঁতো’

সালাউদ্দীন বড় গলায় হাসতে লাগলেন। রাহেলাও মুখে শাড়ি গুজে হাসতে গিয়ে লক্ষ্য করল, কোথায় থেকে যেন বিড়াল মিউ মিউ করছে।

চার চোখে চারদিক খোঁজাখোঁজি করে দেখা গেল, খাবারের টেবিলের অন্ধকার কোনায় হুলো মিউমিউ করতে করতে বিস্মিত চোখে চারদিক চেয়ে দেখছে। হুলোর বিস্মিত হওয়ার কারণটা হয়তো এই যে, ‘অবশেষে জায়গামত এসে পড়েছি’।

চলবে…

-বেলা প্রধান