হৃদয়ে আগন্তুক ( ৬ষ্ঠ পর্ব )

হাসান তার অফিস রুমে বসে কাজ করছে। সে কাজের ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে দরজার দিকে। এখন প্রায় মাঝ দুপুর। অথচ রূপা একবারের জন্যেও বের হয়নি। সে কি এখনো ঘুমুচ্ছে। হাসান একবার ভাবল ডেকে তুলবে কিনা। তারপর ভাবল, থাক যখন ওঠার উঠুক।

রূপা দুপুর পর্যন্ত তার রুমের ভিতরেই থাকল। যদিও তার ঘুম ভেঙ্গেছে অনেক আগেই। কিন্তু দুপুরের পরে তার প্রচন্ড মাথা ব্যথা শুরু হলো। সম্ভবত এতক্ষন না খেয়ে থাকার জন্য। সে রুম থেকে বের হয়ে কিচেনে ঢুকল তারপর নিজেই এক কাপ চা বানিয়ে ব্যাকইয়ার্ডে গিয়ে দাঁড়াল।

তিথিদের বাসার ব্যাকইয়ার্ডের একটা অংশ ঢালু হয়ে নীচে নেমে গেছে। নীচে নামার জন্যে আবার কয়েক ধাপের ইটের সিঁড়ি দেয়া আছে। রূপা প্রথম সিঁড়িটার উপরে বসে দূরের বাড়ি গুলোর উপর দিয়ে লেকের দিকে তাকিয়ে চায়ে চুমুক দিল।

কিছুক্ষন পরেই হাসান এসে দাঁড়াল রূপার পাশে। জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার শরীর ঠিক তো?’

রুপা বলল, ‘হ্যাঁ। কেন হাসান ভাই?’

‘না মানে এত দেরী করে বের হলে তাই ভাবলাম…’

‘এমনিই একটু মাথা ব্যথা করছিল।’ কিছুক্ষন চুপ করে থেকে রূপা আবার বলল, ‘আপনাদের বাসার ব্যাকইয়ার্ডটা খুব সুন্দর। এখানে বসে থাকতে বেশ লাগছে।’

‘হুমম।’

রূপা অবাক হলো। সাধারনত কেউ কোনো কিছুর প্রশংসা করলে উত্তরে ধন্যবাদ জানানো একটা সাধারন ভদ্রতা। কিন্তু হাসান কিছুই বলল না।

হাসান আর কোনো কথা না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। রূপার মনে হলো হাসান কিছু হয়ত বলতে চায় কিন্তু বলছে না। সে বলল, ‘কাল আকাশের সঙ্গে এভাবে চলে যাওয়ায় আপনি কি আমার উপর রাগ করেছেন?’

‘রাগ করবো কেন? তোমার উপর রাগ করার অধিকার কি আমার আছে?’

‘মানে?’

‘মানে তো সহজ রূপা, কারো উপর রাগ করতে হলে রাগ করার অধিকার তো থাকতে হবে, তাই না? তোমার উপর রাগ করার কোন অধিকার নিশ্চয়ই আমার তৈরী হয় নি!’

‘হলে করতেন?’

হাসান সে কথার কোন উত্তর দিল না।

কিছুক্ষন চুপ করে থেকে হাসান বলল, ‘আকাশের সঙ্গে তোমার কি কথা হলো?’

‘এক যুগ পরে দেখা হলে যে ধরণের কথা হয়, তেমনই। না চাইতেও পেছনের অনেক কথাই বলতে হলো। আমি কেন বিয়ে করি নি, পার্থকে এখনো ভুলতে পেরেছি কি না, ইত্যাদি।’

‘ও তোমাকে ভালোবাসতো তাই না?’

‘কে?’

‘আকাশ!’

‘একথা আপনার মনে হলো কেন?’

‘কাল ওর চোখে যে আনন্দ আমি দেখেছি–তাতে করে নিশ্চিত বলে দেয়া যায় যে, সে তোমাকে খুবই পছন্দ করতো।’

‘হয়ত করত। আমরা খুব ভাল বন্ধু ছিলাম।’

‘হয়ত বলছ কেন? তুমি জানতে না?’

‘জেনেছিলাম–হঠাৎ করে ওর হারিয়ে যাবার অনেক পরে এবং সেটা পার্থর কাছ থেকেই।’

‘আকাশ বিয়ে করে নি?’

‘করেছিল, একটা মেক্সিক্যান মেয়েকে। কিন্তু বিয়েটা বেশিদিন টিকেনি। এখন সিঙ্গেল।’

‘ও!’

হাসানকে দেখে মনে হচ্ছে তাকে একধরনের অস্থিরতা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সে একবার রূপার পাশে গিয়ে বসল। তারপর আবার উঠে দাঁড়াল।সিঁড়ির দু ধাপ নীচে নেমে ঘুরে দাঁড়াল রূপার দিকে। একটু ইতস্তত করে বলল, ‘রূপা তোমাকে আমার কিছু কথা বলা দরকার।’

রূপা থমকে গেল। তারপর আস্তে করে তাকাল হাসানের চোখের দিকে–একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে।

‘আমি জানি না আমি যা বলতে চাই, ঠিকমত বোঝাতে পারব কিনা। তবু চেষ্টা করে দেখতে তো ক্ষতি নেই।’

হাসানের ভুমিকা রূপাকে দ্বিধায় ফেলে দিল। সে চুপকরে মুল কথা শোনার অপেক্ষায় রইল।

একটা দীর্ঘ বিরতি দিয়ে হাসান বলল, ‘তুমি একটা চমৎকার মেয়ে। যে কোনো ছেলেরই তোমার সঙ্গ ভালো লাগবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটা বলতে দ্বিধা নেই তোমাকে আমারো ভালো লেগেছে—আমার কিছু অসংলগ্ন আচরনে তোমার কাছে মনে হতে পারে—আমি হয়ত তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছি। ব্যাপারটার একটা ব্যাখ্যা প্রয়োজন।’

এটুকু বলে হাসান একবার রাস্তার দিকে তাকাল। তারপর আবার শুরু করল, ‘আমারো সব সময় ইচ্ছে করে তিথিকে নিয়ে এভাবে ঘুরে বেড়াতে। সুন্দর সুন্দর জায়গা দেখতে। কিন্তু অফিস, সংসার আর তিতলি’র বাইরে ওর জগতে আর কিছুই নেই—আর কিছুই ভাবতে পারে না। আমরা একসাথে শেষ কবে ঘুরতে গিয়েছি মনে নেই। কতবার ওকে নিয়ে মুভি দেখতে চেয়েছি—কখনই হয়ে উঠেনি।’

থেমে থেমে হাসান বলে চলল, ‘সাধারনত হাজব্যান্ডরা ব্যস্ত থাকে—স্ত্রীদের সময় দিতে পারে না, অথচ আমাদের হয়েছে উলটো। তাই তোমাকে নিয়ে যখন ঘুরতে বেরিয়েছি—আমার কাছে অন্যরকম মনে হয়েছে। অন্যরকম একটা ভালোলাগা কাজ করেছে। ক্ষনিকের জন্য হলেও তিথির অভাব আমি বুঝতে পারিনি। আই অ্যাম সরি বাট আই মাস্ট কনফেস!’

রূপা পুরোপুরি নিশ্চিত নয় হাসান আসলে কি বোঝাতে চাচ্ছে।

হাসান আবার বলল, ‘তুমি হয়ত ভাবছ, এসব কথা আমি কেন বলছি? এগুলো কিন্তু কোনো অযুহাত নয়। নিজেকে স্বচ্ছ প্রমান করার কোনো চেষ্টাও নয়। তুমি স্মার্ট মেয়ে, আমি জানি তুমি জানো আমি কি বলতে চাচ্ছি। আমার কোন ব্যবহারে তুমি যদি কষ্ট পেয়ে থাকো, তার জন্যে আমি দুঃখিত। আই অ্যাম ট্রুলি সরি।’

রূপা কি বলবে ভেবে পেল না। সে চুপ করেই রইল।

‘তিথি অত্যন্ত ভালো মনের একটা মেয়ে। অসম্ভব কেয়ারিং-পুরো সংসার, তিতলির স্কুল-হোমওয়ার্ক সব কিছু ও একাই সামাল দেয়। মাসের একটা লম্বা সময় আমাকে বাইরে থাকতে হয়—সে একা মেয়েকে নিয়ে থাকে। একা হাতেই সব কিছু আগলে রেখেছে। ওর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমার কিছু ভুলের কারণে ও কষ্ট পাচ্ছে–’

হাসান আর কিছু বলল না। সে চুপ করে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।

হাসানের কথায় রূপার মনটা একটু খারাপ হলো। এবার সে হাসানকে নিশ্চিত করার জন্য বলল, ‘আমি বুঝতে পেরেছি হাসান ভাই। আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। বরং আমারই উচিত আপনাকে ধন্যবাদ জানানো আমাকে সময় দেবার জন্যে। আমারো অনেক ভালো লেগেছে। সত্যিকার অর্থেই আমি ভাবতে পারিনি আমার সময়টা এত ভাল কাটবে। আপনারা দুজনেই আমার জন্যে যা করলেন—তার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ।’

রূপা উঠে দাঁড়িয়ে হাসানের পাশে দাঁড়াল। তারপর হাসানের হাত ধরে আস্বস্ত করার জন্যে একটা ঝাঁকি দিয়ে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ হাসান ভাই,থ্যাঙ্ক ইউ ফর এভ্রিথিং।’

তিথি দেখল রূপা হাসানের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

গত কয়েকদিনের বিক্ষিপ্ত ঘটনা, সব কিছু মিলিয়ে আজ সকাল থেকেই তিথির মনটা ভীষণ খারাপ ছিল। অফিসে যেতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু কিছু দরকারী কাজ যে গুলো তিথিকেই করতে হতো তাই অনিচ্ছা সত্বেও সে অফিসে গেল। রূপাকে সময় দেয়া হচ্ছে না, এই ব্যাপারটা নিয়েও তার মন খারাপ। তাই ভাবল আজ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে দুই বান্ধবী মিলে জম্পেশ আড্ডা দিবে। রূপাকে নিয়ে হাসানের বাড়াবাড়িটাও ওকে ভাবাচ্ছে। মনটা খচ-খচ করছে। কিন্তু হাসান তো এমন তরল চরিত্রের মানুষ ছিল না কখনই,সে তাকে চিনে। তারপরেও মানুষের মন বলে কথা।

তিতলিকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসে পৌঁছেই দ্রুত হাতের কাজ গুলো সেরে ফেলার চেষ্টা করল তিথি। কয়েকটা ক্লায়েন্টের ফোন কল ছিল–সে গুলো করল। কয়েকটি ইমেইল রিপ্লাই করল। দুটো টিকেট চেঞ্জের রিকোয়েস্ট ছিল, সেগুলো করে ক্লায়েন্টকে নতুন কনফার্মেশন ইমেইল করতে করতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল। তিথি ওর অফিস ম্যানেজারকে বলে লাঞ্চ ব্রেকে বাসায় ফিরে এলো।

ঘরে ঢুকে তিথি দেখল বাসায় কেউ নেই। হাসান নেই ওর অফিস রুমে। রূপার রুমও খালি। তিথি ভাবল হাসান হয়তো রূপাকে নিয়ে লাঞ্চ করতে বাইরে গেছে কেননা ফ্রিজে দু’দিনের পুরনো খাবার ছাড়া তেমন কিছুই নেই। খাবারের কথা মনে হতেই সে কিচেনে গেল। ফ্রিজ থেকে পুরনো খাবার বের করে গরম করার জন্যে মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে কিচেনের জানালা দিয়ে ব্যাকইয়ার্ডে তাকাল এবং সঙ্গে সঙ্গে রক্ত শূন্য হয়ে গেল তার মুখ। তিথি সরে এসে ঘরের পেছনের কাঁচের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আবার দেখল রূপা আর হাসানকে—হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। তিথি কাল বিলম্ব না করে বের হয়ে এলো তারপর তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকল, ‘হাসান!’

হাসান আর রূপা দুজনেই চমকে ঘুরে তাকাল। দেখল তিথি দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে হাত ছেড়ে দিয়ে দুজনেই অপ্রস্তুত ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।

তিথি কঠিন স্বরে বলল, ‘এসব কি হচ্ছে, হাসান?’

হাসান সামনে এগিয়ে এসে আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এত তাড়তাড়ি ফিরে এলে যে? শরীর খারাপ?’

‘না শরীর খারাপ না। শরীর ঠিকই আছে।’

‘তাহলে?’

‘কি তাহলে? কেন আমি এসে ডিসটার্ব করলাম?’

‘এসব কি বলছো রূপা?’

‘রূপা?’

‘সরি, আই মিন তিথি!’

‘মাথার মধ্যে বেশ ভালো ভাবেই ঢুকেছে তাহলে?’

‘কি বলছো তুমি?’

‘কি বলছি, বুঝতে পারছো না?’

‘না বুঝতে পারছি না।’

‘ভেতরে এসো, তোমার সাথে আমার কথা আছে।’ বলেই তিথি রূপার দিকে একটা অবিশ্বাসের দৃষ্টি দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।

হাসান একবার তাকাল রূপার দিকে। দুজনেই এতটাই বিব্রত বোধ করছে যে কেউ কারো দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারল না।

প্রচন্ড অপমানে রূপার কেঁদে ফেলার মত অবস্থা হলো। সে মাথা নিচু করে ঘরে ঢুকল। দেখল তিথি বসে রয়েছে অন্যদিকে তাকিয়ে। রূপা লিভিং রুমের টেবিল থেকে কর্ডলেস ফোনটা নিয়ে তার রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

হাসান ভেতরে ঢুকতেই তিথি উঠে দাঁড়াল। তারপর বলল, ‘কি বুঝতে পারছ না বলো। আবার বলো না যে আমি যা ভাবছি তা ঠিক না।’

‘হ্যাঁ তাই।’

‘আমার নিজের চোখকে অবিশ্বাস করতে বলো? এখন যা দেখলাম আর দু’দিন ধরে যা দেখছি সে গুলো?’

হাসান বলল, ‘তিথি, প্লিজ আমার কথা শোন, আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলব।’

‘ঠিক এই কথাটাই যে বলবে—তাও আমি জানতাম। কি বোঝাবে তুমি? তুমি ভেবেছ আমি কিছু বুঝি না? আমি তো তিতলি না, তিথি। আই এক্সালি নো হোয়াটস গোয়িং অন। ডোন্ট ইভেন ট্রাই টু ফুল মী!’ বলেই তিথি সোফায় বসে অঝরে কান্না শুরু করল।

হাসান বুঝতে পারছে না কি করবে। সে অসহায়ের মত বসে রইল অন্য সোফাতে।

রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়ে চুপচাপ বসে রইল রূপা। অপমান আর অভিমানে তার চোখ ভিজে গেছে। কিছুতেই সে নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। কিছুক্ষন চুপ করে থেকে তার হ্যান্ড ব্যাগ থেকে একটা কাগজে লেখা নাম্বার দেখে ডায়াল করল।

আকাশের এক দুঃসম্পর্কের চাচা থাকেন ডালাসে। তার কিছু বন্ধুও আছে। তবে এখানে এলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তার চাচার বাসাতেই থাকে সে। আজকে তার ফিরে যাবার কথা ছিল। কিন্তু সে যায়নি। আকাশের খুব ইচ্ছা হলো রূপার সঙ্গে আরেকটিবার দেখা করে যায়। কিন্তু সমস্যা হলো রূপার কোনো ফোন নেই—আর তাড়াহুড়োয় ওদের কারো ফোন নাম্বার নেয়া হয়নি। কাল রাতে রূপাকে নামাতে হয়েছে বলে বাসার ঠিকানাটা ওর মনে আছে। ইচ্ছে করলে সে চলে যেতে পারবে অনায়াসে। কিন্তু যদি বাসায় না থাকে। তাই সে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ভেবে পেল না। কিন্তু ওর মন বলছে রূপা একবার হলেও একটা ফোন করবে। রূপার কাছে ওর নাম্বার আছে। কাল রাতে রেষ্টুরেন্টে ডিনার করার সময় একটা কাগজে লিখে রূপার হাতে দিয়ে বলেছিল, ‘যখন ইচ্ছে ফোন করো। রিমেম্বার, আই অ্যাম অনলি এ ফোন কল অ্যাওয়ে। কল দিলেই চলে আসব সে আমি যত দুরেই থাকিনা কেন। আমি তোমার ফোনের অপেক্ষায় থাকব।’

রূপা হাসতে হাসতে বলেছে, ‘বাব্বা-এত প্রেম কোথায় ছিল এতদিন?’

আকাশের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ওর মন বলছে এটা রূপার ফোন। সে ফোন ধরেই বলল, ‘রূপা!’

রূপা কিছুক্ষন চুপ করে থাকল। ফোনের ওপাশ থেকে আকাশ তার ভারী নিঃশ্বাসটা বুঝতে পারল। সে আবার বলল, ‘রূপা, তুমি?’

‘হ্যা।’ ভারী কন্ঠে রূপা বলল, ‘তুমি কি আমাকে নিয়ে যেতে পারবে?’

‘হ্যাঁ পারব। কখন আসতে হবে বলো?’

‘এক্ষুনি।’

‘নো প্রব্লেম। আই অ্যাম অন মাই ওয়ে।’

আকাশের সংগে কথা শেষ করে রূপা দ্রুত তার সুটকেসটা গুছিয়ে নিল। কিছু ব্যবহারের কাপড় ছিল বাথরুমে সেইসাথে প্রসাধনীর যা যা ছিল সব ভরে ফেলল। তারপর সাইড টেবিল থেকে একটা কাগজ বের করে তিথির জন্যে একটা ছোট্ট মেসেজ লিখল। মেসেজ না বলে চিঠিও বলা যেতে পারে।

তিথি,
আমি চলে যাচ্ছি। আরো দুটো দিন থাকার ইচ্ছে ছিল কিন্তু পরিস্থিতি যেভাবে জটিল হচ্ছে তাতে সংকট আরো বেড়ে যেতে পারে। জেনে শুনে সংকট বাড়ানোর কি দরকার।

আমি যেদিন প্রথম আমেরিকায় ট্রেনিং-এর চিঠি পেলাম—সেদিন খুব খুশী হয়েছিলাম সেটা আমেরিকায় আসার জন্যে না–শুধু তোর সাথে দেখা হবে এই ভেবে। দুর্ভাগ্য আমার তোর সাথে দেখা হলো কিন্তু তার পরিনতি যে এমন হবে তা আমার কল্পনার অতীত ছিল। আফসোস থেকে গেল যে তোর সাথে দু’দন্ড সময় কাটাতে পারলাম না। যদিও এতে তোর কোন হাত ছিল না। আমেরিকার জীবনটাই যে এমন, হয়ত না এলে কিছুই বুঝতে পারতাম না।

যাওয়ার আগে দুটি কথা বলা দরকার।

হাসান ভাইকে তোর চেয়ে পৃথিবীর আর কেউ ভালো চিনে সেটা আমি বিশ্বাস করি না। তারপরেও একজন মেয়ে হয়েই বলছি–আমার ধারনা, বিয়ের আগে অথবা পরে, তুই ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের একাকী সান্নিধ্যে সে যায়নি। মানুষটা খুবই সরল এবং কিছুটা বোকাও। সে ভনিতা করতে জানেনা। না, তার হয়ে সাফাই গাইছি না। আমি শুধু আমার উপলব্ধির কথাটা তোকে বললাম। তুই তাকে ভুল বুঝিস না। এটুকুই শুধু আমার অনুরোধ থাকবে তোর কাছে।

আবার কোনদিন দেখা হবে কিনা জানিনা। পারলে ক্ষমা করিস। তিতলির জন্য আদর।

ভালো থাকিস।
ইতি, তোর রূপা।

লেখা শেষ করে রূপা বড় একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ল। তারপর চিঠিটা ভাঁজ করে নাইটস্ট্যান্ডের উপরে রেখে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকল।

তিথি আরো কিছুক্ষন কেঁদে কেটে তার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। তিথিকে না ডেকে হাসান গেল তিতলিকে আনতে। গাড়িতে উঠেই তিতলি বুঝতে পারল তার বাবার মুড খারাপ। সাধারনত হাসান খুব হেসে হেসে জিজ্ঞেস করে, তোমার স্কুল কেমন গেল আজকে? এনিথিং ইন্টারেস্টিং টু শেয়ার? তখন তিতলি গরগর করে সব কথা বলা শুরু করে। বাসায় তেমন কোনো কথা না বললেও গাড়িতে উঠলেই তিতলি নন-স্টপ কথা বলে। সে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ইউ ওকে বাবা?’

‘ইয়েস, আই’ম ফাইন।’ হাসান তিতলির দিকে না তাকিয়েই অন্যমনস্ক ভাবে বলল।

‘ইউ সিমস আনমাইন্ডফুল।’

হাসান কোনো কথা না বলে সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে থাকল। তিতলি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়্যার ইজ রূপা আন্টি?

‘শী’জ অ্যাট হোম।’

‘আই থট শী’জ উইথ ইয়্যু!’

‘এত প্রশ্ন করছ কেন তিতলি? বললাম না সে বাসায়? তোমার আম্মুও বাসায়।’

হঠাৎ করে হাসানের রেগে যাওয়ায় তিতলি ঘাবড়ে গেল। সে বুঝতে পারল না তার বাবার কি হয়েছে। তবে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে সেটা বুঝতে তার কষ্ট হলো না। সেদিনও সে দেখেছে তার আম্মুকে বাবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে। কিছু একটা হচ্ছে কিন্তু সে বুঝতে পারছে না সেটা কি। মনে হয় বড়দের ব্যাপার তাই সে আর কোনো কথা না বলে চুপ রইল।

হাসান বাসায় ফিরে ড্রাইভওয়েতে গাড়ি পার্ক করতেই তিতলি বলল, ‘আই’ম সরি, বাবা।’ বলেই সে দৌঁড়ে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল। হাসান চুপচাপ বসে রইল গাড়িতে।

আমি এক্ষুনি আসছি বলে আকাশ এলো চার ঘন্টা পর। ওর দেরী হচ্ছে দেখে এক ঘন্টা পর রূপা আরেকবার ফোন করল তাকে। কিন্তু সে ফোন ধরল না। ইতিমধ্যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে। এই সময়টুকু পার করতে রূপাকে যথেষ্ট ধৈর্য্যের পরিচয় দিতে হলো। রূপা ভেবে পেল না, তার সাথেই কেন সব সময় এমন হয়। সে ঘন ঘন ঘড়ি দেখল। কয়েকবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। এবং আশ্চর্য্যজনক  ভাবে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল।

রূপার ঘুম ভাঙ্গল তিতলির ডাকে। সে কতক্ষন ঘুমিয়েছে মনে করতে পারল না। সে উঠে দরজা খুলে দিতেই তিতলি বলল, ‘তোমার বন্ধু এসেছে।’ তিতলির মুখে পরিষ্কার বাংলা শুনে রূপার বেশ ভালো লাগল। হঠাৎ করে মনে হলো, তিথির মেয়েটা বেশ সুন্দর হয়েছে। ওর খুব ইচ্ছে হলো ওকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু তার আগেই তিতলি দৌঁড়ে চলে গেল।

রূপা চোখ-মুখে পানি দিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে তার সুটকেসটা নিয়ে দ্রুত বের হয়ে এলো। এসেই দেখল আকাশ বসে আছে হাসি হাসি মুখ করে। হাসানের সঙ্গে কথা বলছিল হয়তো। হাসানকেও দেখল, কিন্তু বেশ গম্ভীর। বোঝাই যাচ্ছে দুপুরের বিষয়টা তাকে নিশ্চয়ই যন্ত্রনা দিচ্ছে। সে সামনে এগিয়ে এসে আকাশকে বলল, ‘এতক্ষনে এলে?’

আকাশ হাসতে হাসতেই বলল, ‘আর বলো না, একটা ঝামেলা হয়েছিল। পরে বলছি সবকিছু।’

‘ঠিক আছে চলো।’

হাসান চমকে তাকাল। এবং বুঝতে পারল রূপা চলে যাচ্ছে একেবারে। সে কি বলবে বুঝতে পারল না।

আকাশ ওর সুটকেসটা নিয়ে বের হয়ে গেল। রূপা বলল, ‘হাসান ভাই, আমি চলে যাচ্ছি। অনেক কষ্ট দিয়ে গেলাম।’

হাসান কিছু বলল না। অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।

তিতলি কাছেই দাঁড়ানো ছিল—রূপা তিতলিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। তিতলি বুঝতে পারছে না রূপা আন্টি কাঁদছে কেনো। সেও রূপাকে জড়িয়ে ধরে থাকল কিছুক্ষন।

হাসানের বলতে ইচ্ছে করছে অনেক কিছুই কিন্তু সে কিছুই বলতে পারল না। রূপা এভাবে হুট করে চলে যেতে চাইবে সেটা ছিল তার ধারনার বাইরে। রূপার এভাবে চলে যাওয়াটা শোভনীয় হচ্ছে না কিন্তু তাকে থাকতেও বলতে পারছে না। নিজেকে হঠাৎ করেই খুব ছোট মনে হলো। তবুও হাসান একবার বলল, ‘তিথিকে বলে যাবে না।’

রূপা কিছু বলল না। তিতলিকে একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরল শুধু। তারপর ওর কপালে একটা চুমু দিয়ে বের হয়ে গিয়ে আকাশের গাড়িতে উঠল।

আকাশ একবার তাকাল রূপার দিকে তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বের হয়ে গেল ড্রাইভওয়ে থেকে।

হাসান ওদের চলে যাওয়া পথের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে দরজা বন্ধ করে ঘুরে দাড়িয়েই দেখল তিথি অঝরে কাঁদছে।

(চলবে…)

  • ফরহাদ হোসেন
    লেখক-নির্মাতা
    ডালাস, টেক্সাস