হৃদয়ে আগন্তুক ( ৭ ম পর্ব )

হাসান ভেবেছিল তিথিকে কিছুই বলবে না। তিথি এই মুহূর্তে সামনে না এলে হয়ত কিছু বলতও না। কিন্তু সে নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না। তাকে বলতেই হলো, ‘রূপার সামনে এভাবে রিয়্যাক্ট না করলেই কি হতো না, তিথি? ও তো এমনিতেই চলে যেত! এভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দেবার তো কোন প্রয়োজন ছিল না।’

রূপা চলে যাবার পর থেকেই তিথি কাঁদছিল। সেই কান্নার রেশ ধরেই সে ফুলে ফুলে বলল, ‘আমি কাউকে অপমান করে তাড়িয়ে দেইনি, চলে যেতেও বলিনি।’

‘কিন্তু বাকীও তো রাখনি কিছু। তোমার কাছ থেকে অন্তত আমি এরকম আচরণ আশা করিনি।’

‘তাহলে কি আশা করেছিলে। চোখের সামনে সবকিছু দেখার পরেও চুপ করে থাকলেই তুমি খুশী হতে?’

‘আমি ভাবতে পারছি না। ব্যাপারটাকে এভাবে কমপ্লিকেটেড করে ফেলবে তুমি। কি লাভ হলো তোমার?’

‘আমার জায়গায় তুমি হলে কি করতে? হাউ উড ইউ ফিল? তুমি মেনে নিতে?’

হাসান সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকল। কিছুক্ষন পর আবার বলল, ‘তোমার যা বলার আমাকে একা বলতে পারতে। মেয়েটা কি ভাবল? নিজেকে এতো ছোট না করলে কি হতো না?’

‘ছোট হলে আমি হয়েছি, তুমি তো হওনি, তোমার এতো লাগছে কেন? আর রূপার ভাবনাটাই তোমার কাছে এখন বড় হয়ে গেল? আমি কি ভাবছি বা ভাবতে পারি, তাতে তোমার কিছু এসে যায় না? নাকি তুমি কেয়ার করো না?’

‘কেন কেয়ার করব না? অবশ্যই করি।’

‘তাহলে?’

‘তাহলে আর কি? বলেছি তো ভুলটা আসলে আমারই হয়েছে…’ বলেই হাসান চলে যেতে উদ্যত হতেই তিথি বলল-

‘অবশ্যই তোমার ভুল। তোমার কারনেই আজ রূপা আর আমি দুজন দুজনের কাছে ছোট হয়ে গেলাম।’

‘হ্যাঁ আমার ভুল হয়েছে—আমি রূপাকে সময় দিয়েছি, তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। কিন্তু সেটা তো আমার করার কথা ছিল না। ছিল তোমার অথবা আমাদের একসাথে। তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড দেশ থেকে এসেছে অথচ তুমি দু’টো দিন ছুটি নিতে পারনি। আমার কাছে ফেভার চেয়েছ অথচ আবার আমাকেই ব্লেম করছো।’

‘হ্যাঁ ফেভার চেয়েছিলাম কারন আমার কাজে অনেক প্রেসার ছিল। আর ফেভার চেয়েছি বলেই কি তুমি…’

‘কি? কি করেছি আমি? তুমি এমন ভাবে রিয়্যাক্ট করছো যেন মনে হচ্ছে আমাকে আর রূপাকে একসাথে তুমি বিছানায় দেখেছ?’

হাসানের একথায় তিথি ভ্রূ কুঁচকে তাকাল।

হাসান আবার বলল, ‘আরে বাবা, ব্যাকইয়ার্ডে সে আমার হাত ধরেছিল, শুধু এটুকু বলার জন্যে যে হাউ গ্রেটফুল শী ইজ–আমাদের প্রতি সে কৃতজ্ঞ। দ্যাটস অল।’

‘কেউ কি আমার কষ্টটা বুঝবে?’ তিথি হাসানকে নয়, যেন নিজেকেই বলল।

এবার হাসান একটু নরম স্বরে বলল, ‘আই ফিল ইয়োর পেইন তিথি, আই রিয়েলি ডু। আই কজড ইউ পেইন অ্যান্ড আই’ম রিয়েলি সরি ফর দ্যাট।’

তিথি আর কিছু বলল না। নীরবে কাঁদতে থাকল।

হাসান কিছুক্ষন চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে সরে গেল তিথির সামনে থেকে।

তিথি কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। কান্নার দমকে বুকটা ফুলে ফুলে উঠছে। তিতলি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল। বড়দের কথার মধ্যে আসতে হয় না, তাই সে কাছে আসেনি।

মাকে এই প্রথম কাঁদতে দেখছে না তিতলি। বাবার সঙ্গে ঝগড়া হলে আগেও কেঁদেছে। কিন্তু এইভাবে ফুলে ফুলে নিঃশব্দে কান্নাটা অন্যরকম। তিতলির বুকের ভিতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠল।

হাসান সরে যেতেই তিতলি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর আস্তে করে বলল, ‘মামি, এভরিথিং উইল বী অলরাইট। সব ঠিক হয়ে যাবে।’


বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর আকাশ পাশে তাকিয়ে দেখল রূপা মুখ অন্ধকার করে বসে আছে। সে নিশ্চিত, কিছু একটা হয়েছে কিন্তু সেটা কি জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে কি না সে বুঝতে পারল না। কিন্তু রূপার মলিন মুখটা দেখে তার খুব খারাপ লাগছে। হয়তো দুপুরে কিছু খায় নি। কে জানে? আকাশ রূপাকে জিজ্ঞেস করল, ‘দুপুরে খেয়েছ কিছু?’

রূপা কিছুক্ষন চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল, ‘না।’

‘সকালে?’

রূপা আবারো মাথা নাড়ল, ‘না।’ তারপরে বলল, ‘চা খেয়েছি।’

‘শুধু চা? সারাদিন আর কিছু খাওনি?’ বলেই আকাশ গাড়ি নিয়ে থামাল হাইওয়ের পাশে একটা ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টে। রূপা যেতে চাইল না। কিন্তু আকাশ নাছোড়বান্দা। রূপাকে নিয়েই সে ঢুকল রেস্টুরেন্টে ।


সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়েছে অনেক্ষন আগেই। তিতলি আজ একা একা তার হোমওয়ার্ক শেষ করে রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়েছে। মামির গায়ের গন্ধ ছাড়া তার ঘুম আসেনা কিন্তু আজ তার মামির মন খারাপ। তাই সে তাকে আর না ডেকে একা কিছুক্ষন চেষ্টা করে ঘুমিয়ে পড়েছে।


রূপা চুপ করে বসে আছে। আকাশ রূপার সামনে একটা ঢাউস সাইজের বার্গার এনে দিয়ে বলল, ‘নাও খাও!’
রূপা এত মন খারাপের মধ্যেও আকাশের কথা বলা আর ভাবভঙ্গি দেখে একটু হাসলো।আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইউ আর ক্রেজী।’

আকাশ হেসে ফেলল। বলল, ‘ইউ আর রাইট।’ আকাশের কথার ভাবেই বলে দেয়—যার অর্থ দাঁড়ায়, তোমার জন্যেই আমার সব পাগলামী। তুমি যতক্ষন পাশে আছ, আমি পাগলামী করেই যাব।


রাত বাড়ার সাথে সাথে হাসান উপলব্ধি করল, তিথির সাথে এভাবে কথা বলাটা তার ঠিক হয়নি। তার তো কোনো দোষ নেই। তিথি যা করেছে সেটা যে কোনো মেয়েই করবে। এমনকি হাসান নিজেও রিয়াক্ট করত। যতই ভাবছে তিথির জন্যে হাসানের মনটা ততই খারাপ হতে থাকল।

হাসান গেল তাদের রুমে। তিথি শুয়ে আছে চুপচাপ–বাঁকা হয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে। সে ঘুমিয়ে পড়েছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। হাসান আস্তে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর হাত রাখল তিথির পিঠে। তিথি একটু কেঁপে উঠল। কিন্তু সে ফিরে তাকাল না। শক্ত হয়ে পড়ে রইল।

হাসান বলল, ‘সারাদিন কিছু খাও নি। চলো খাবে।’

তিথি নীরব।

হাসান আবারো বলল, ‘রাগ করেছো ঠিক আছে কিন্তু খাবে না কেন? উঠে এসো, খাওয়ার সঙ্গে রাগ করতে নেই।’

তিথি তবুও কিছু বলল না।

হাসান বলল, ‘আমিও কিন্তু সারাদিন কিছু খাই নি। তুমি না খেলে আমিও খাবো না।’ বলেই হাসান তাকে জোড় করে টেনে তোলার চেষ্টা করল।

তিথি ঝটকা দিয়ে হাসানের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘এ সব মেয়েলী ঢং আমার সঙ্গে দেখাতে এসো না। তুমি এখান থেকে যাও।’

‘একবার তো সরি বলেছি–আবারো বলছি। আই’ম সরি।’

‘শুধু সরি বললেই সব ঠিক হয়ে যায়?’ তিথি গায়ের উপর চাদর টেনে নিয়ে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকল।

হাসান বুঝতে পারছে না কি করলে তিথির রাগ কমবে। সে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে বের হয়ে গেল।

আকাশের গাড়ি ইন্টারস্টেট হাইওয়ে-৩৫ ধরে দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে। রাতের রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে অনেক কম। এতো রাতে মাঝে মাঝে দু’একটি ১৮ চাকার ট্রাক ছাড়া সাধারন গাড়ি দেখা যাচ্ছে না। দু’দিকে মাঠের পর মাঠ খালি পরে আছে। কালো রাস্তা আঁচলের মত লম্বা করে বিছানো। হঠাৎ করেই একটি ১৮ চাকার ট্রাক পাশের লেনে চলে এসে ছুটছে সমান গতিতে। আকাশের হাতের স্টিয়ারিং  সামান্য কেঁপে উঠল। সে তার গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়ে ট্রাকটাকে চলে যেতে দিল। একবার তাকাল রূপার দিকে। রূপা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে—শূন্য দৃষ্টিতে।

তিথির চোখে ঘুম নেই। ক্লান্তি আর অবসাদগ্রস্ত শরীরটা নিয়ে শুয়ে ছিল বিছানায়। এপাশ ওপাশ করেছে অনেক, তবু ঘুম আসেনি। হাসানের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমাতে তার অস্বস্তি লাগছে। সে হাসানের ঘুমিয়ে পরা পর্যন্ত অপেক্ষা করে উঠে পড়লো।

তিথির বড় অভিমান হলো রূপার উপরে। সে যাই বলুক—তাই বলে এভাবে চলে যেতে হবে? একবার তার সাথে কথা বলে গেলে কি হতো? আকাশের সাথে যদি দেখা না হতো, তাহলে? তিথির নিজের উপরেও ভীষন রাগ হলো। কিন্তু সেই বা কী করবে?

রূপা যদি কোনোদিন যোগাযোগ না করে তাহলে ওর সাথে আর কখনোই কথা হবে না। তিথির মনে ক্ষীণ আশা—হয়ত রূপা ওকে একবার ফোন দিবে। ফোনটা দেখা দরকার। সে দ্রুত গেল লিভিং রুমে। কিন্তু সেখানে ফোন নেই। তিথির সন্দেহ হলো—রূপা নিশ্চয়ই আকাশকে ফোন করেছিল, না হলে আকাশ জানবে কি করে যে রূপা চলে যেতে চায়? ভাবতে ভাবতেই সে গেল রূপার রূমে। দেখল ফোনটা নাইটস্ট্যান্ডে। সে ফোন হাতে নিতেই দেখল একটা ভাঁজ করা কাগজ। তিথি কাগজটা খুলে দেখল রূপার লেখা কথা গুলো। সে একবার পড়লো। আবার পড়লো। পড়তে পড়তেই তার চোখ ভিজে উঠল।

তিথি কলার আইডি চেক করলো। না কোন ফোন আসেনি। সে সেন্ট বাটনে চাপ দিয়ে দেখল একটা নাম্বার। সময় মিলিয়ে তিথি নিশ্চিত হলো এটা আকাশেরই নাম্বার। সে একবার ভাবল, তারপর রি-ডায়াল বাটনে চাপ দিয়ে ফোনটা কানের কাছে ধরে চুপ করে রইল।

আকাশের ফোন বেজে উঠল। এতো রাতে কে ফোন করল? আকাশ গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে তার ফোনটা নিল। সে একবার ফোনের দিকে তাকাল। নাম্বারটা পরিচিত লাগছে। আকাশ জানে এই নাম্বার থেকে আগেও তার কাছে কল এসেছে। সে ফোনটা নিয়ে বলল, ‘হ্যালো।’

তিথি বলল, ‘আমি তিথি। রূপা কি আছে আপনার সঙ্গে?’

আকাশ পাশে দিকে তাকিয়ে দেখল রূপা সীটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। সে বলল, ‘জ্বী আছে।’

‘একটু দেয়া যাবে?’

আকাশ আস্তে করে ডেকে তুলল রূপাকে। তারপর ফোনটা তার হাতে দিয়ে বলল, ‘তোমার ফোন।’

রূপা একটু অবাক হয়ে ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো।’

রূপার গলা শুনে তিথি ফুপিয়ে কেঁদে ফেলল। তারপর বলল, ‘তুই এভাবে চলে যেতে পারলি?’

রূপ চুপ করে রইল।

তিথি বলল, ‘একবার বলে গেলে কি হতো? আমি কি তোকে আটকে রাখতাম?’

রূপা কি বলবে? অভিমানে তার বুকটা ভার হয়ে আছে। সে কিছুই বলতে পারছে না।

‘কিছু বলছিস না কেন?’

রূপা বলল, ‘কি বলবো?’

তিথি কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল, ‘কিছুই বলবি না।’

‘আই’ম সরি।’

‘আমি তোকে সরি বলতে বলেছি?’

‘বাট আই’ম রিয়েলি সরি। আমার জন্যেই তো…’

আকাশ তাকালো রূপার দিকে। সে এখনো জানে না আসলে কি ঘটেছে। রূপাকে নিয়ে আসার সময় একবার জিজ্ঞেস করেছিল, কি হয়েছে–কোন সমস্যা? রূপা এড়িয়ে গিয়েছে। আকাশও আর কিছু জিজ্ঞেস করে নি। কিন্তু তার স্বল্প বুদ্ধিতে অন্তত এটুকু বুঝতে পেরেছে তিথি আর রূপার মধ্যে যদি কিছু হয়ে থাকে সেটা হাসানকে নিয়েই। সেদিন মুভি থিয়েটারে হাসানের সঙ্গে রূপাকে দেখেও তার কাছে একটু খটকা লেগেছিল। আকাশ সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার কান খাড়া হয়ে আছে প্রথম থেকেই তিথি আর রূপার ফোন কথনের দিকে।

‘আমি আগামী উইকএন্ডে অস্টিন যাচ্ছি—দু’দিন তোকে নিয়ে ঘুরব। শপিং করব। মুভি দেখব। তুই অস্টিন পৌঁছে আমাকে ফোন দিবি।’

মুভির কথা আসতেই রূপার মনে পড়ল, হাসান বলেছিল তিথিকে নিয়ে কখনো মুভি দেখতে যেতে পারেনি। তাহলে কি হাসান ভাই মিথ্যে বলেছে? কি জানি? রূপা এখন আর কিছু ভাবতে চায় না। সে কোনো কথা বলল না। তিথিও চুপ করে রইল কিছুক্ষন। তারপর বলল, ‘আমি কি করব বল, আমি তো আর ইচ্ছে করে…’ কথা শেষ না করে তিথি থেমে গেল। কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল, ‘ঠিক আছে রাখি। ভাল থাকিস।’

ফোন কেটে দিয়ে তিথি রূপার বিছনাতেই শুয়ে রইল কিছুক্ষন। তারপর উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়েই দেখল মস্ত বড় একটা চাঁদ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সেই ডাকে সারা দিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল তিথি।

চলবে…

  • ফরহাদ হোসেন
    লেখক-নির্মাতা
    ডালাস, টেক্সাস