হৃদয়ে আগন্তুক ( ৮ম এবং শেষ পর্ব )

শেষ রাতের দিকে হঠাৎ করেই হাসানের ঘুম ভেঙ্গে গেল। অস্বস্তি নিয়ে চোখ মেলে তাকাল। পাশ ফিরে দেখল তিথি বিছানায় নেই। সে উঠে বসে তাকাল চারিদিকে। উঠে গিয়ে লাগোয়া বাথরুমের দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখল, সেখানেও নেই। হাসান জানে তিথির একটা মন খারাপের জায়গা আছে। পেছনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল–যা ভেবেছিল তাই। তিথি ব্যাকইয়ার্ডের সিঁড়িতে বসে আছে। কাকতালীয় ভাবে ঠিক ঐ একই জায়গায় বসে ছিল রূপা। রূপার কথা মনে হতেই হাসান ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলল।


আকাশ হঠাৎ করে গাড়ির গতি কমিয়ে দিল। সে পরের এক্সিট দিয়ে বের হয়ে থামল একটা ফাঁকা মাঠের সামনে। বেগুনি-নীলে মেশা ব্লুবনেটস ফুলে ছেয়ে আছে সারা মাঠ। টেক্সাসের জাতীয় ফুল ব্লুবনেট। শহুরে টিপটপ গোলাপ বাগানের থেকে একদম আলাদা এই বনফুল। কাউ বয় বা কাউ গার্লের মতোই গ্রাম্য, সাধারণ কিন্তু সুন্দর।

আকাশ গাড়ির জানালা নামিয়ে দিল। ঝিরিঝিরি ঠান্ডা বাতাস বইছে বাইরে। জানালা খোলা মাত্রই এক পশলা ঠান্ডা বাতাস এসে লাগল রূপার মুখে। রূপা চোখ বন্ধ করে ছিল। হঠাৎ বাতাসের স্পর্শে সে চোখ মেলে তাকিয়ে একবার দেখল চারপাশটা তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কি ব্যাপার আকাশ, এখানে থামলে কেন? এনিথিং রং?’

আকাশ তাকিয়ে আছে সামনে যতদূর দৃষ্টি যায়। দিগন্ত রেখায় লাল সুর্যের আভা দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই সূর্য উঁকি দেবে। বিস্তৃত খোলা মাঠে বিছানো ব্লুবনেটসের উপর দিয়ে যখন সূর্য হাসবে তখন সে রূপাকে বলবে তার মনের কিছু না বলা কথা। রূপার সঙ্গে আবার কোনদিন দেখা হতে পারে সেটা সে স্বপ্নেও কোনদিন ভাবে নি। কিন্তু প্রকৃতির রহস্য বোঝা বড়ই কঠিন। এটা প্রকৃতির রহস্য নয়ত কি? আকাশের দৃঢ় বিশ্বাস, প্রকৃতির ইচ্ছেতেই রূপার সাথে তার এভাবে আবার দেখা হয়েছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, রূপাকে তার না বলা কথা গুলো বলতেই হবে। কিন্তু রূপার যা মনের অবস্থা এখন সেখানে তাকে আবার একটা দ্বন্দের মধ্যে ফেলতেও সে চাচ্ছে না। আকাশ রূপার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে রইল সূর্য ওঠার অপেক্ষায়।


হাসান প্রায় নিঃশব্দে পেছনের দরজা খুলে এসে দাঁড়াল তিথির পাশে। তিথি মাথা ঘুরিয়ে দেখল হাসানকে। কিন্তু কোনো কথা না বলে আবার তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। হাসান বসল তিথির পাশে। কেউ কারো সঙ্গে কথা না বলে দুজনেই তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। এ যেন একদৃষ্টে শূন্যে তাকিয়ে থাকার খেলা। কে কতক্ষন তাকিয়ে থাকতে পারে। একটা লম্বা সময় পার করে হাসান বলল, ‘সারারাত ঘুমাওনি তাই না?’

তিথি কোনো উত্তর দিল না। অস্বস্তিকর নীরবতা। কিছুক্ষন পর হাসান আবার বলল, ‘তোমাকে একটা কথা বলতে চাই, তিথি!’


আকাশ গাড়ি থেকে নেমে বাইরে এসে দাঁড়াল। রূপাও এসে দাঁড়াল তার পাশে। চারিদিকে একবার তাকিয়ে অসম্ভব রকম ভালো লাগায় ভরে গেল তার মন। নীল-বেগুনীর মিশ্রনে বিছানো ব্লুবনেটসের চাদরের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষন। তারপর আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বলো কি বলতে চাও?’


হাসান একটা গভীর নিশ্বাস নিয়ে থেমে থেমে বলল, ‘আমি সত্যিই দুঃখিত এবং লজ্জিত। আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। আমার আচরণে তুমি কনফিউজড হয়েছ। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার মনে কোন লুকানো অভিপ্রায় ছিল না। আমি যা করেছি, তার কোন ব্যাখ্যা হয়ত আমি দিতে পারব না। কিন্তু আমি স্বীকার করছি—আমার ভুল হয়েছে।’

তিথি হাসানের দিকে ফিরেও তাকাল না। যেভাবে ছিল সেভাবেই তাকিয়ে রইল সামনের দিকে।


রূপা তাকিয়ে আছে আকাশের মুখের দিকে। আকাশ ধীরে ধীরে বলল, ‘আমি একজন হতভাগ্য মানুষ। জীবনে কিছুই পাওয়া হলো না। সারাজীবন কেমন যেন মরীচিকার পেছনে দৌঁড়ে, জীবনটাকেই মাটি করলাম শুধু। যা পাওয়ার জন্য এই ট্র্যাকে দৌড় শুরু করেছিলাম একদিন–তা কি আমার কোনদিনই পাওয়া হবে না, রূপা?’

‘আমি তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না, আকাশ।’


হাসান আবার বলল, ‘প্রত্যেক মানুষের জীবনেই একটা সময় আসে, যখন সে তার পারিপার্শ্বিকতা এবং বাস্তবতা ভুলে গিয়ে নিজের ইমোশন কে বেশী প্রশ্রয় দিয়ে বসে। অবশ্য একসময় সে তার ভুল বুঝতে পারে এবং অনুশোচনাও করে।’


আকাশ আবার বলল, ‘মাঝে মাঝে ভীষণ অবাক হতাম আবার ভালোও লাগত! মানুষে মানুষে এতো ভালোবাসা কখনো দেখিনি আমি।’

‘কার কথা বলছো তুমি?’

‘পার্থর মত একটা বোহেমিয়ান আগোছালো ছেলেকে তোমার মতো দীপ্তিময়ী একটা মেয়ে সারাক্ষণ আগলে রাখত। দেখে অবাক হতাম। তোমার কাছে এলেই সে খুঁজে পেত তার আপন নীড়ের ঠিকানা।’


হাসান বলল, ‘আমি জানি না, আমার কি হয়েছিল তিথি। কেন জানি না, আমিও হঠাৎই আমার বাস্তবতাকে ভুলে গিয়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও আমার ইমোশনকে প্রশ্রয় দিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে ঠকাইনি।’


আকাশ বলল, ‘আমি জানি না, আমি কেন তোমাকে বলতে পারিনি তখন। কেন জানি না আমিও পার্থর মত পালিয়ে গিয়েছিলাম, হয়ত তোমাকে আমার পাওয়া হবে না কোনদিনই, হয়ত সেই ভয়েই… কিন্তু এমন একটা নীড়ের ঠিকানা আমার বড় প্রয়োজন এখন।’


হাসান বলল, ‘আমি জানি তুমি অনেক শক্ত মনের মানুষ, সহনশীল, বুদ্ধিমতী। তবুও তোমার মনে যদি কিছুমাত্র সন্দেহ থেকে থাকে…’ বলেই হাসান তার একটি হাত তিথির কাঁধের উপর দিল, তারপর আবার বলল, ‘এই নতুন সূর্য ওঠা ভোরের আলোতে আমি তোমাকে ছুঁয়ে বলতে পারি তিথি, রূপা আর আমার মাঝে কিছুই ঘটেনি।’


রূপা তাকিয়ে আছে অনেকদূরে। আকাশ বলল, ‘যে কথাটা তোমাকে এক জীবনে বলতে পারিনি, তা বলার উপযুক্ত সময় হয়ত এখন না। পাছে তোমার মনে হতে পারে আমি তোমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছি।’

‘এখন আর কোন কিছুতেই আমি কিছু মনে করি না, আকাশ। তোমার সাথে এভাবে দেখা না হলে, আমি হয়ত তিথির ওখানেই আরো দুটো দিন থেকে তারপর আমার গন্তব্যে চলে যেতাম। কাজেই…’

‘আমি জানি জীবনে অনেক কষ্ট তুমি পেয়েছো। অনেক ঘাত-প্রতিঘাতে তুমি হয়ত এখন অন্যরকম হয়ে গেছ। তবুও–এই নতুন সূর্য ওঠা ভোরের আলোতে আমি তোমার কাছে একটা অনুরোধ করতে চাই, তুমি রাখবে?

রূপা অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘কি অনুরোধ?’

‘আমি যদি তোমাকে আর ফিরে যেতে না দেই, তুমি থাকবে এখানে? এই দেশে? আমার সাথে—নীল সমুদ্রের পাড়ে?’ একটু থেমে আকাশ যোগ করল, ‘একের পর এক বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। সামনে বিশাল সমুদ্র। নীল আকাশ জুড়ে জ্যোৎস্নার লুটোপুটি খেলা। চোখ বন্ধ করতেই কানে সমুদ্রের গর্জন। দেখবে না তুমি?’

রূপা প্রথমেই কিছু বলতে পারল না। চুপ করে থাকল। তার মনের মধ্যে কিসের যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। কিছুক্ষন ভেবে সে ঘুরে দাঁড়াল আকাশের দিকে। তারপর হেসে দিয়ে বলল, ‘উত্তরটা কি তোমার এখনই চাই?’

রূপার হাসিতে এমন কি ছিল কে জানে, আকাশ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। সে জানে এই হাসির গভীরতায় কি লুকিয়ে আছে। এই হাসি একটি বিশ্বাসের হাসি। এই হাসির অর্থ হলো আমি আছি তোমার সাথে।

আকাশ হাত বাড়িয়ে দিল রূপার দিকে। কোন দ্বিধা না করেই রূপা ধরল তার হাত। তারা দুজন-দুজনের হাত ধরে তাকিয়ে রইল সামনে। ব্লুবনেটসের চাদরে ছাওয়া বিস্তৃত খোলা মাঠের উপর দিয়ে দিগন্ত রেখায় তখন নতুন সূর্য হাসছে।


হাসান অনেক্ষন আর কিছু বলল না। তার যা বলার ছিল বলা হয়েছে। এখন তিথি কি বলে সেটা জানার জন্যে সে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।

তিথি হঠাৎ করেই যেন বদলে গেল। সে কাধ থেকে হাসানের হাত সরিয়ে দিল আস্তে করে। তারপর যেভাবে সামনে তাকিয়ে ছিল সেভাবেই বলল, ‘তোমার কথা শেষ হয়েছে?’

হাসান চুপ করে থাকল। সে আর কিছু বলছে না দেখে তিথি আবার বলল, ‘এবার তাহলে আমার কিছু কথা তুমি শোনো।’

হাসান অবাক হয়ে তাকাল।

তিথি বলল, ‘আই নিড এ ব্রেক। তিতলিকে নিয়ে আমি কিছুদিন আলাদা থাকতে চাই।’

হাসান ভাবতেই পারেনি তিথি এমন কিছু বলবে। তার এই রূপও সে আগে কখনো দেখেনি। সে কিছুটা ভড়কে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন?’

‘কারণ, তোমার সঙ্গে এক ঘরে এক বিছানায় আমার ঘুমুতে কষ্ট হচ্ছে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আই ফিল সাফোকেটেড—আই নিড টু ব্রিদ।’

হাসান পাংশু মুখে তাকিয়ে রইল। সে কিছু খুঁজে পেল না কি বলবে।

তিথি আবার বলল, ‘তুমি জানতে চাইলে, সারারাত ঘুমাই নি, তাই না? ইয়েস, দ্যাটস রাইট—আমি সারারাত ঘুমাই নি। নট এ সিঙ্গেল মিনিট। চেষ্টা করেও পারিনি। তুমি আমার ঘুম নষ্ট করে দিয়েছ!’

হাসান চুপ করে থাকল।

তিথি তার সমস্ত রাগ-ক্ষোভ, অপমান-অভিমান একসাথে উগড়ে দিচ্ছে একের পর এক। সে বলে চলল, ‘যে নোংরা কথা গুলো তুমি আমাকে বলেছ, যে ক্ষত তুমি সৃষ্টি করেছ–ভেবেছ একবার ‘সরি’ বলাতেই সব মুছে যাবে?’

হাসান কোনো উত্তর না দিয়ে পেছনের রাস্তার দিকে তাকাল।

‘বিশ্বাস হলো কাচের মত–একবার ভেঙ্গে গেলে যতই জোড়া লাগানো হোক না কেন দাগ ঠিকই থেকে যায়! আমার কষ্ট টা কি জানো?’ বলেই তিথি সরাসরি তাকাল হাসানের চোখের দিকে। হাসান অস্বস্তি বোধ করলেও চোখ সরাল না। তিথি আবার বলল, ‘আই’ম নট আপসেট দ্যাট ইউ হার্ট মাই ফিলিংস—আই’ম আপসেট দ্যাট ফ্রম নাউ অন আই ক্যান্ট বিলিভ ইয়্যু! ইয়্যু ব্রোক মাই ট্রাষ্ট—বাট আই উন্ট লেট ইউ ব্রেক মি!’

হাসান হঠাৎ করে বাতাস চলে যাওয়া বেলুনের মত চুপসে গেল। সে আর কিছুই ভাবতে পারছে না।

কিছুক্ষন চুপ করে থেকে উঠে দাঁড়াল তিথি। তারপর ঘুরে চলে যাওয়ার জন্য কয়েক পা বাড়াতেই-

হাসান বলল, ‘ক্যান আই গেট এ লাষ্ট চান্স?’

তিথি ঘুরে তাকাল। একবার গভীর দৃষ্টি নিয়ে দেখল হাসানকে। তিথি আগে থেকেই জানত, হাসান তাকে এসব কথা বলে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। হাসান হয়ত যা বলেছে সব কথাই তার মন থেকেই বলেছে। হয়ত সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে। সত্যি হোক আর মিথ্যা, তিথি সেগুলো নিয়ে আর ভাবতে চায় না। সে নিজের সঙ্গে অনেক বোঝাপড়া করেই সিদ্ধান্ত যা নেবার নিয়েছে। সে কিছুতেই তার সিদ্ধান্ত এক কথায় বদলে দিতে পারে না। তিথি আবার ঘুরে দাঁড়াল। এবার এক পা বাড়াতেই হাসান বলল-

‘গিভ মি ওয়ান লাষ্ট চান্স—প্লিজ!’ হাসানের কন্ঠে অনুনয় ঝরে পড়ল।

তিথি দাঁড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ করে তার কি হলো–সে বুঝতে পারছে না সে কি করবে? তার কি উচিৎ হাসানকে একবার সুযোগ দেয়া? তার চিন্তা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।

হাসানের মন বলছে তিথি তাকে ক্ষমা করে দিবে। সে অপেক্ষায় থাকল, এই বুঝি তিথি তার সেই মায়া ভরা হাসি দিয়ে এগিয়ে এসে হাসানের হাত ধরে বলবে, চলো সূর্য ওঠা দেখি। হাসান হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইল—তিথির হাত ধরার অপেক্ষায়।

সারি সারি বাড়ির পেছনে বিস্তৃত খোলা লেকের পানির উপর দিয়ে দিগন্ত রেখায় তখন নতুন সূর্য হাসছে।

তিথি এখন কি করবে?


ব্লুবনেটসের তীর ঘেঁষে কান্ট্রি রোড দিয়ে আকাশের গাড়ি ছুটে চলেছে গন্তব্যে। এখনো যেতে হবে অনেকটা পথ। আকাশের চোখে কোনো ক্লান্তি নেই—নেই কোনো হতাশা, অস্থিরতা। এ যেন এক অন্য আকাশ। সে শীষ বাজিয়ে গাইতে থাকল জন ডেনভারের বিখ্যাত গান, ‘কান্ট্রি রোড টেক মি হোম!’

  • ফরহাদ হোসেন
    লেখক-নির্মাতা
    ডালাস, টেক্সাস