মায়া

আজ ৮দিন ধরে হাসপাতালের বেডে জীবন মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে ওয়ালীউল্লাহ ওলী। বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টাকারীরা বেঁচে থেকেও মরণ যন্ত্রণা কাকে বলে অনুভব করতে পারে। হ্যাঁ ওলী বিষপানের রোগী। আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে হারপিক খেয়ে নিয়ে। যখনই ওলীর কেবিনে যাই দেখি তার ফুফু বিছানার পাশে বসে কাঁদছে নয়ত ওলীর জন্য আল্লাহকে ডাকছে। স্থানীয় হাসপাতালে ওলীর পাকস্থলী ক্লিয়ার করা হয় কিন্তু কন্ডিশন ডিটোরিওরেইট করায় তাকে সদর হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। মুখে অক্সিজেনের মাস্ক আর হাতে স্যালাইনেরর নল লাগানো ওলীকে দেখে বড্ড মায়া জমেছে আমার মনে। আমি এ হাসপাতালের নার্স। রোগীকে সেবা করাই আমার কর্তব্য। অনেক রোগীকে সেবা করে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে বাড়ি পাঠিয়েছি, কতজন আবার পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন এ হাসপাতালেই। তাই জীবন মৃত্যুর সাথে আমি বেশ অভ্যস্ত। তবুও ওলীর প্রতি যেন বেশি মায়া পড়ে যাচ্ছে। ওলীর মুখটা দেখলেই বারবার আমার চাচাতো ভাই রাফির মুখটা চোখে ভেসে উঠে। হয়তো ওলীর প্রতি মমত্বোবোধের কারনেই আমি ডিউটিতে সময়ের আগে চলে আসি আবার ডিউটি শেষ হলেও আরও কিছুক্ষণ থেকে যাই হাসপাতালে।

এ আটদিনে একটা জিনিস ভাল করে খেয়াল করছি সেটা হল হাসপাতালে ভর্তি হবার পর থেকে ওলীর কাছে তার এ ফুফু আর এক মামা ছাড়া তেমন কেউ আসেনি । অন্যান্য পেশেন্টকে দেখতে সারাদিন কত রিলেটিভরা আসে কিন্তু ওলীকে দেখতে তেমন কেউ আসেনি। ডাক্তার ডাকা,পরীক্ষা নিরীক্ষা সবকিছু নিয়ে ব্যস্ত ওলীর মামা আর দেখাশোনার জন্য তার এ ফুফু।ব্যাপারটা আমাকে বেশ অবাক করছে এ কদিন ধরে।

গতকাল আমার ডিউটি ছিল রাত ১০টা-সকাল ৭টা পর্যন্ত। রাতে কোয়ার্টার থেকে একা আসতে তেমন অসুবিধা হয়না এখন। টর্চ হাতে গেইট পেরিয়ে বারান্দায় পা রেখেই দেখি ওলীর ফুফু কাঁদছেন এককোণে দাঁড়িয়ে। এক অজানা অাশংকায় বুকটা কেঁপে উঠলো আমার। ব্যস্ত হয়ে উনার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,”কি হয়েছে আন্টি? ওলী কেমন আছে? কাঁদছেন কেন? ” কথাগুলো বলতে বলতেই ওলীর কেবিনে ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখলাম ওলী ঘুমাচ্ছে।হাতটা হাতে নিয়ে ওলীর নার্ভ চেক করলাম।নাহ্ নরমাল আছে। ওলীর ফুফু লতিফা খাতুনকে আমার সাথে বাহিরে নিয়ে আসলাম। সমস্ত হাসপাতালে গুনগুন আওয়াজ কেবল শিশু ওয়ার্ড থেকে মাঝে মাঝে নবজাত শিশুর কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল। লতিফা আন্টিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আন্টি, ওলীর কি কেউ নেই? আপনারা দুজন ছাড়া আর কাউকে তো আসতে দেখি না! ওলীর ফুফু করুণ নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলেন,”ওলীর প্রতি আত্মীয় স্বজনরা বেশ বিরক্ত, তাই তারা কেউ আসেনি।”

—কিন্তু কেন? এমন মরণাপন্ন অবস্থাতেও কেউ না এসে কেমন করে থাকতে পারে? বিরক্তির কারণটা কি এগজেক্টলি?
—- ওলী আরও চারবার সুইসাইড এটেম্পট করেছে!
কথাটা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম!, “কি বলছেন এসব?
—-হ্যাঁ, দুইবার হাতের রগ কেটেছে। অনেক রক্তপাত ঘটিয়েছে আর দুইবার অনেকগুলো ঘুমের ঔষধ খেয়ে নিয়েছিল।স্থানীয় হাসপাতালে স্টমাক ক্লিয়ার করা হয়েছিল। আর এবার তো হারপিক! তাকে সবাই খুব বুঝায়,সে কারোর কথাতে কর্ণপাত করে না। জীবনকে সে ভালবাসেনা এটাই বাস্তব।
—-হ্যাঁ তার হাতে কেনোলা পুশ করার সময় আমি রগ কাটার দাগগুলো দেখে কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিলাম।কিন্তু তার এমন আচরণের কারন কি আন্টি?
—- একাকীত্ব ওলীকে ছিড়ে খুবলে খাচ্ছে গো মা! তোমরা তো জানো ওলী হাঁটতে পারে না।
— হ্যাঁ জানি।ওর মেরুদন্ডের হাঁড় ভেঙে যাওয়াতে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনা।
—- হ্যাঁ মা। ওলী বড্ড অভাগা। কপালের সুখগুলো কেমনে যেন হঠাৎ করে উড়ে গেল।

ওলীর বাবা উপজেলা ট্রেজারি অফিসে চাকরি করতো।বিভিন্ন উপজেলায় ফ্যামিলি নিয়ে থাকতো কিন্তু ওলী অষ্টম শ্রেণিতে উঠলে তার বাবা তাকে স্থানীয় সরকারী হাইস্কুলে ভর্তি করাতে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। সেখানেই একটা মেয়ের সাথে তার বেশ ভাল বন্ধুত্ব হয় নাম ফারিয়া। মেয়েটাই প্রথম ওলীকে প্রপোজ করে। এ বয়সে কিশোর কিশোরীদের চারপাশ আকাশের রং এর মত রঙিন থাকে। শুরু হয় দুজনের বন্ধুত্ব্ব থেকে প্রেম। ধীরে ধীরে বাড়ির সবাই জানতে পারে তাদের ভালবাসার সম্পর্কের কথা। বেশ ভালই চলছিল তাদের প্রতিটা দিন, তাদের পড়াশোনাও যেন সকলকে হিংসা করানোর মত ভালভাবে চলতে লাগলো। বাঁধ সাধলো একটা ছোট্ট দূর্ঘটনা। রিক্সা দিয়ে বাসায় ফেরার পথে পিছন থেকে ধাক্কা দেয় একটা ট্রাক।ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে ওলী। পিছন থেকে এসে মুহূর্তেই ধাক্কা দেয় তাকে এক অটো। পিঠে মারাত্মক আঘাত লাগে তার।

মেরুদন্ডের মেইন হাড় ভেঙে তিন টুকরা হয়ে যাওয়াতে ওলী সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনা।হুইল চেয়ারে চলাচল করে।তার পড়াশুনা বন্ধ করেনি যেমন তেমন বন্ধ করেনি ফারিয়াকে ভালবাসাও।মেয়েটি যেন ওলীর প্রতি আরও বেশি কেয়ারিং হয়ে গেল।ওলীর ক্লাস এটেন্ড করা,নোট সংগ্রহ করে দেয়া,পড়া বুঝিয়ে দেয়া অতঃপর তার সাথে প্রেম করা সবই চলছিল।ওলীর পুরো পৃথিবীটাই সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল ফারিয়ার মধ্যে। ফারিয়ার ভালবাসায় আর যত্নে ওলী পরীক্ষাতে ভাল রেজাল্ট করেই ইন্টার পাশ করে।
ইন্টারমেডিয়েট পাশের পর ওলী সমাজ বিজ্ঞানে অনার্স ভর্তি হয় আর ফারিয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। ফারিয়ার ওলীর প্রতি এতটা ইনটেনসিফাইড হওয়াটা তার পরিবার মেনে নিতে পারছিল না। প্রথম প্রথম বন্ধুত্ব কিংবা ছেলেটির অসহায়ত্বের জন্য তার বাবা মা কিছু বলেনি কিন্তু যখন দেখছে যে ফারিয়াকে আর আটকানো যাচ্ছেনা তখনই তারা তাকে বিয়ে দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়। ফারিয়া ওলীকে বিয়ে করবে বলে বাসায় জানিয়ে দেয়। কিন্তু ওলী তো অসুস্থ! ফারিয়ার বাবা মায়ের মতে,”একটা পঙ্গু ছেলের কাছে তোকে বিয়ে দেয়ার থেকে কেটে টুকরা করে নদীতে ভাসিয়ে দেব।” তবু্ও ফারিয়া পিছু হটেনা। শুরু করে বিয়ে ভাঙার খেলা।
কিন্তু স্বয়ং ভাগ্যদেবী যদি বিমুখ হন,মানুষের কি সাধ্য তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার!
বেশ সুদর্শন এক যুবকের সাথে বিয়ে ঠিক করে ফারিয়ার মামা,অতঃপর জোর পূর্বক ফারিয়াকে বিয়ের জন্য রাজি করানো হয়।
২রা জানুয়ারি ছিল ফারিয়ার বিবাহবার্ষিকী। এ দিনটাতে ওলী যেন পাগলের মত হয়ে যায়।” কথাগুলো একদমে বলে গেলেন লতিফা খাতুন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ওলীর মা বাবা নেই? ”
–বাবা আছে কিন্তু মা নেই। চারমাস হল তার মা মারা গেছেন। ফারিয়ার বিয়ে হওয়ার পর তার মা ছিল তার একমাত্র সঙ্গী। কিছুতেই যখন ঘুম আসতো না, ওলীর মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতো, মুখে তুলে খাইয়ে দেয়া, গোসল করানো সব একসময় ফারিয়া করতো
কিন্তু ফারিয়ার বিয়ের পর ওলী তার আম্মার মধ্যে ফারিয়াকে ফিরে পেত যেন। কিন্তু আল্লাহ ওলীর কপালে এত সুখ লিখেন নি হয়তো। ”
—- ওলীর আম্মার কি হয়েছিল, আন্টি?
—- হার্ট এটাক। মাঝরাতে হার্ট এটাকে মারা যায় উনি। ওলীকে ছোট থেকেই আমি সব থেকে বেশি ভালবাসি।আমার কোন সন্তানাদি নেই।তাই তার এমন অসহায়ত্বে আমি নিজেকে আটকে রাখতে পারিনি, ছুটে এসেছি।তিনমাস ধরে আমি ওলীর কাছে থাকছি। ফারিয়ার বিয়ের পর থেকে এতবার সুইসাইড করতে চেয়েছে তাই ওলীর বাবা, চাচা তার উপর রেগে আছে।”

ডিউটির টাইম হওয়াতে আমি ফিরে আসলাম স্টাফ রুমে। পরের দিন সকালে কোয়ার্টারে যাওয়ার আগে ওলীকে একনজর দেখতে গেলাম। মাথায় হাত রাখতেই চোখ মেলে তাকালো ছেলেটি! আহ্ কি মায়া কাড়া চোখ দুটি!
—কেমন আছো?
—ভাল একটু
— বসেন আপু।
—না,তুমি রেস্ট নাও, বিকেলে কথা হবে।
রুমে ফিরে নাস্তা খেয়েই লম্বা ঘুম দিলাম। বিকালে ডিউটি নেই তবুও হাসপাতালে আসলাম। ওলী কিছুই খেতে পারছেনা,গলা জ্বলছে। বড্ড কষ্ট লাগলো মনটায়। লতিফা আন্টিকে বললাম, আন্টি আপনি একটু রেস্ট নেন। বাইরে থেকে ঘুরে আসেন।আমি আছি এখানে ”
আন্টিটি পানির জগটা নিয়ে নিচের টিউবওয়েল থেকে ভাল পানি আনতে গেলেন।
—ওলী, তুমি আমার ভাইয়ের মত। তোমার উপর বেশ মায়া হচ্ছে কেন জানি। “আপু”বলেই সে আমার হাতটা চেপে ধরে কাঁদতে লাগলো। আজ থেকে তুমি আর একা নও ওলী, আজ থেকে তোমার এ বোনটা আছে। কখনো কোন দুঃখ তোমাকে স্পর্শ করবেনা কথা দিলাম ভাই আমার। আজ থেকে আমি তোমার মায়ের অভাব দূর করবো, হয়তো ফারিয়াকে তোকে ফিরিয়ে দিতে পারবো না তবে তার অভাববোধ তোর মাঝে আমি রাখবো না। আমি ভালবাসার জন্য এক ভাইকে একবার হারিয়েছি,তোর মাঝে আমি তাকে ফিরে পেয়েছি। তোকে আমি হারাতে দিবো না।
শুরু হল ভাইবোনের এক ভালবাসার বন্ধন।

বি:দ্র: একজন পাঠকের বাস্তব জীবনের ঘটনার প্রেক্ষিতে লিখা। চরিত্রগুলো বাস্তব। গল্পটা পুরোটা পড়ে লাইক দিলে খুশি হবো। না পড়ে লাইক দিলে লেখার সার্থকতা থাকে না।